ধর্ম ও পুজোপাঠ শহর

খাটুশ্যাম মূর্তির প্রাণপ্রতিষ্ঠা পুরুলিয়ায়, ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়

পুরুলিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই খাটুশ্যাম মন্দির যে আগামী দিনে জেলার অন্যতম প্রধান পর্যটন ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে চলেছে, তা উদ্বোধনের প্রথম দিনেই প্রমাণিত।
খাটুশ্যাম মূর্তির প্রাণপ্রতিষ্ঠা পুরুলিয়ায়, ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়

 

সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:

পুরুলিয়া শহরের বুকে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকলেন পুরুলিয়ার আপামর ধর্মপ্রাণ মানুষ। পুরুলিয়া শহরের গাড়িখানা এলাকায় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলো খাটুশ্যাম মূর্তির। সুদূর রাজস্থানের খাটুশ্যাম নগর থেকে আনা দেব মূর্তিটি এক বিশাল ও বর্ণিল শোভাযাত্রার মাধ্যমে মন্দিরে নিয়ে আসা হয়। উদ্বোধনের প্রথম দিন থেকেই ভক্তদের ঢল নেমেছে মন্দির প্রাঙ্গণে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দা নন, ভিন জেলা এবং ভিন রাজ্য থেকেও হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমিয়েছেন এই নবনির্মিত মন্দিরে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মন্দির চত্বরে মোতায়েন ছিলো বিশাল পুলিশ বাহিনী।

পুজো কমিটির সেক্রেটারি অত্যন্ত আবেগের সাথে জানান যে প্রায় ৫ বছর আগে এই মন্দির নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে বুক বেঁধেছিলেন তাঁরা। এত দ্রুত যে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে, তা ভাবেননি।
তিনি জানান আরও জানান,২১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই প্রাণ প্রতিষ্ঠার মহাপূজো চলবে ২৮ জুন পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল সাড়ে চারটের পর থেকে ভক্তদের জন্য বাবা খাটুশ্যামের দর্শনের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওড়িশার দক্ষ শিল্পীদের নিখুঁত কারুকার্যে এবং তাদের নিজস্ব স্থাপত্য শৈলীতে গড়ে তোলা হয়েছে এই বিশালাকার মন্দিরটি।

বিশাল এই কর্মযজ্ঞ সামলানোর জন্য কমিটিতে রয়েছেন মোট ১৬০ জন সদস্য, যার মধ্যে পুরুলিয়ার পাশাপাশি বাইরের জেলার লোকেরাও অন্তর্ভুক্ত আছেন। দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে এবং শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে মন্দিরের নিজস্ব ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপশি জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকাও ছিল চোখে পড়ার মতো। পুরুলিয়ার একাধিক সামাজিক সংস্থাও এই ব্যবস্থাপনায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে।

মন্দির কমিটির প্রেসিডেন্ট খাটুশ্যাম বাবার মহিমা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, "কলিযুগে শ্রীকৃষ্ণেরই অপর রূপ হলেন 'শ্যাম বাবা'। আজ সারা বিশ্বজুড়ে তাঁর মহিমা ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁকে বলা হয় 'হারে কা সাহারা' অর্থাৎ অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়। যখন মানুষের আর কোনো পথ থাকে না, তখন শ্যাম বাবাই হাত বাড়িয়ে দেন। আর তাঁর এই মঙ্গলময় উপস্থিতির প্রমাণ এই মন্দিরের বাস্তবায়ন।"

তিনি আরও জানান, জমিজট কাটিয়ে বিষ্ণু সাহা ওরফে ওম সাহা-র কাছ থেকে আংশিক জমি প্রাপ্তি এবং স্বর্গীয় মোহনলালজী বগড়িয়ার বিশেষ অনুপ্রেরণাতেই এই অসম্ভব সম্ভব হয়েছে। মন্দিরে দর্শনের সময়সীমা সম্পর্কে তিনি জানান, সকালে একটি নির্দিষ্ট সময় ছাড়াও প্রতিদিন বিকেল ৪টে থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মন্দির সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকবে।

মন্দিরের ভেতরে পুজোর সামগ্রী বিক্রেতাদের মধ্যেও আনন্দের অন্ত নেই। এক বিক্রেতা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, "এখানে এসে মন ভরে যাচ্ছে। বাবার রাজকীয় শৃঙ্গার  এবং ভোগ নিবেদন দেখার মতো। ভগবানের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস  সুগন্ধি আতর এবং ময়ূরের পালক নিয়ে আমরা প্রস্তুত। বাবার চরণে ভক্তি অর্পণ করুতে প্রত্যেক ভক্তরই আসা দরকার।"

মন্দিরে পুজো দিতে আসা ভক্ত মনীষা লাহা বলেন, "আজ মন্দিরের উদ্বোধন দেখে অভিভূত হয়ে পড়েছি। এত বড় আয়োজন আর এত মানুষের সমাগম দেখে বিশ্বাসই হচ্ছে না যে এটা আমাদের পুরুলিয়া! বিশেষ করে এখানে জুতো খোলার এবং লাইনে দাঁড়ানোর যে চমৎকার শৃঙ্খলা ও নিয়ম করা হয়েছে, তা একঝলকে অযোধ্যার রাম মন্দিরের ব্যবস্থাপনার কথা মনে করিয়ে দেয়।"
পুরুলিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই খাটুশ্যাম মন্দির যে আগামী দিনে জেলার অন্যতম প্রধান পর্যটন ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে চলেছে, তা উদ্বোধনের প্রথম দিনেই প্রমাণিত।