উৎসবের আলোয় ব্লক

দেউলঘাটার কালো দুর্গার প্রিয় প্রসাদ পোস্তর বড়া

দেবী এখানে গৌরী নন, ঘোর কৃষ্ণবর্ণা। এখানে না আছে থিমের চাকচিক্য, নেই আলোর ঝলকানি। ঘন জঙ্গলের মাঝে প্রাচীন মন্দিরে প্রায় ১২০০ বছরের কষ্টিপাথরের দেবীই এখানে পুজোর মূল আকর্ষণ। ষষ্ঠী থেকে ভক্ত-দর্শনার্থীদের ভিড়ে অন্য রূপ নেয় পুরুলিয়ার আড়শার দেউলঘাটা।
দেউলঘাটার কালো দুর্গার প্রিয় প্রসাদ পোস্তর বড়া

 

 

নিজস্ব প্রতিনিধি, দেউলঘাটা:

 

দেবী এখানে গৌরী নন, ঘোর কৃষ্ণবর্ণা। এখানে না আছে থিমের চাকচিক্য, নেই আলোর ঝলকানি। ঘন জঙ্গলের মাঝে প্রাচীন মন্দিরে প্রায় ১২০০ বছরের কষ্টিপাথরের দেবীই এখানে পুজোর মূল আকর্ষণ। ষষ্ঠী থেকে ভক্ত-দর্শনার্থীদের ভিড়ে অন্য রূপ নেয় পুরুলিয়ার আড়শার দেউলঘাটা।  আর সেখানের মন্দিরেই ভক্তি ও নিষ্ঠায় আরাধনা করা হয় কষ্টিপাথরের কালো দুর্গাকে।

লোকসংস্কৃতির গবেষক সুভাষ রায় বলেন, "দেউলঘাটায় মূলত নবম-দশম শতাব্দীতে ইট ও পাথরের ওড়িশি রেখশৈলীর দেউল গড়ে উঠলেও, বর্তমানে কেবল দুটি ইটের দেউল টিকে রয়েছে। গবেষকদের মতে স্থানটি শুরুতে জৈন কেন্দ্র হলেও পরে ব্রাহ্মণ্য ধর্মে রূপান্তরিত হয়, যা এখানকার দশভূজা দুর্গা, গণেশ ও অন্যান্য মূর্তিতে স্পষ্ট। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বহু মূল্যবান ঐতিহ্য নষ্ট হয়েছে এবং বর্তমানে বাকি প্রাচীন মূর্তিগুলি সংরক্ষণের অভাবে বাইরেই পড়ে রয়েছে"।

দেউলঘাটা এমনিতেই পুরুলিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনস্থল। চারদিকে জঙ্গল, কাছেই কংসাবতী নদী। তারই মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন মন্দিরটির গায়ে ছড়িয়ে রয়েছে পাথরের নানা ভাস্কর্য। মন্দিরের স্থাপত্যেও মিশে রয়েছে ইতিহাসের নানা অধ্যায়। স্থানীয়দের দাবি, পাল আমলে এই দেউলগুলি তৈরি হলেও এলাকায় জৈন ধর্মের প্রভাব রয়েছে দেউলগুলিতে। মূর্তিটি আরও ঢের প্রাচীন।  চারপাশে ছড়িয়ে থাকা রেখ শিল্প শৈলীর নানা নিদর্শন আজও যেন সেই সুদূর অতীতের গল্প বলে।


পুরোহিত রাজীব গঙ্গোপাধ্যায় বলেন,
"দেউলঘাটার প্রাচীন দুর্গা মন্দিরের অন্যতম বিশেষত্ব হলো কষ্টিপাথরের দুর্গামূর্তি, যার ডান পা মহিষের পিঠে স্থাপিত। পাল আমলেরও আগের এই মন্দিরে নিত্যপূজার পাশাপাশি দুর্গোৎসবে বিশেষ জাঁকজমক হয় এবং দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তদের সমাগম ঘটে। মন্দিরের পুরোহিত রাজীব গাঙ্গুলীর মতে, জঙ্গলে ঘেরা এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে প্রাচীন রীতি ও নিষ্ঠা মেনেই আজও পূজা উদযাপিত হয়ে আসছে"।
দেউলঘাটার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে দেবীমূর্তি। কষ্টিপাথরে তৈরি কালো দুর্গা। প্রথার বিরুদ্ধে দেবীর ডান পা রয়েছে মহিষের উপর।  হাজার বছরের পুরনো এই মূর্তিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস ও আবেগ দীর্ঘ দিনের। সারা বছরই নিয়ম মেনে দেবীর নিত্যপুজো চলে। কিন্তু শরৎ এলেই বদলে যায় মন্দির চত্বরের পরিবেশ।
পুজোর চার দিন দেউলঘাটায় শুরু হয় বিশেষ আয়োজন। নিয়ম মেনে ষষ্ঠীতে হয় দেবীর বোধন। পুজো ঘিরে চলে ভান্ডারার আয়োজনও। সকাল থেকে সন্ধ্যা—দূরদূরান্ত থেকে আসতে শুরু করেন দর্শনার্থীরা। শুধু পুরুলিয়া জেলা নয়, পার্শ্ববর্তী জেলা এবং ভিন্‌রাজ্য থেকেও বহু মানুষ পুজোর সময়ে এখানে হাজির হন। পুজোর আয়োজনে জয়পুর থানার তুন্তা গ্রামের সিংহ পরিবারের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।

তুন্তা গ্রামের বাসিন্দা‌ ভুবন সিংহ বলেন,
"জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও দেবীর দর্শনে সারা জেলা ও পার্শ্ববর্তী ঝাড়খণ্ড থেকে প্রচুর দর্শনার্থী এই আশ্রমে আসেন। পূজোর দিনগুলোতে অন্ন ১১ রকমের তরকারি ও ভাজাসহ, লুচি-পায়েস ও খিচুড়ি ভোগ দেওয়া হয়, যার মধ্যে মায়ের প্রিয় হিসেবে আলু পোস্ত ও পোস্তর বড়া উল্লেখযোগ্য। তিনদিন ধরে বলি অনুষ্ঠান ও ভান্ডারার আয়োজন করা হয়, যার যাবতীয় খরচ সঞ্জয় গাঙ্গুলি ও রাজপুত পরিবারের মাধ্যমে পরিচালিত আশ্রম থেকেই আসে"।

প্রকৃতির কোলে মন্দির। প্রকৃতির মধ্যেই দেবীর আরাধনা। তাই দেউলঘাটার পুজোয় বাহুল্যের চেয়ে বিশ্বাসই বড়। পুজোর আর হাতে গোনা কয়েক দিন। ইতিমধ্যেই মন্দির চত্বরে শুরু হয়ে গিয়েছে প্রস্তুতি। ইতিহাস, প্রকৃতি আর লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধনে এ বারও দেউলঘাটায় শরতের চার দিন অন্য রকম হয়ে ওঠার অপেক্ষা।