নিজস্ব প্রতিনিধি, বাঘমুন্ডি:
প্রত্যন্ত আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামের বাড়ির দাওয়ায় বসে আছেন স্বয়ং জেলা শাসক। জানতে চাইছেন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা কি শুধুই কাগজের পাতায়, নাকি তা পৌঁছায় একদম শেষ প্রান্তের মানুষের কাছেও? এই প্রশ্নটারই এক ইতিবাচক উত্তর মিলল পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম ভূপতি পল্লীতে। দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক সমাজের মূল স্রোত থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা বিলুপ্তপ্রায় বিরহোড় জনজাতির পাশে এবার সরাসরি গিয়ে দাঁড়াল জেলা প্রশাসন। কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের বৈঠক নয়, খোদ জেলাশাসক সুধীর কোন্থম গত শুক্রবার দলবল নিয়ে হাজির হলেন বিরহোড়দের মাটির উঠোনে। মাটিতে বসেই শুনলেন তাঁদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভাব-অভিযোগের কথা, আর তার ভিত্তিতেই নিলেন তাৎক্ষণিক ৬ দফা বড় পদক্ষেপ।
প্রশাসনের এই বিশেষ প্রতিনিধি দলে জেলাশাসকের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন) সুদীপ পাল এবং বাঘমুন্ডির বিডিও আর্য তা।
আলোচনার শুরুতেই উঠে আসে এক চরম বাস্তব। গ্রামের বহু শিশু এবং কিশোর-কিশোরীর কোনো জন্ম শংসাপত্র নেই। আর এই নথির অভাবে তৈরি করা যায়নি তাদের আধার কার্ড। ফলে একাধিক সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এই জনজাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। বিষয়টি জানা মাত্রই জেলাশাসক নির্দেশ দেন, কোনো জটিল প্রক্রিয়া ছাড়াই দ্রুত এই শিশুদের জন্ম শংসাপত্র দিয়ে পরিচয়পত্র তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে।
পাশাপাশি, ঝালদা মহকুমাশাসক কার্যালয় দূরবর্তী হওয়ায় এই অনগ্রসর সম্প্রদায়ের মানুষদের যাতে জাতিগত শংসাপত্র পেতে কোনো হয়রানির শিকার হতে না হয়, তার জন্য ব্লক অফিস থেকেই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিডিও-কে। সরকারি প্রকল্পের টাকা সরাসরি অ্যাকাউন্টে পাওয়ার জন্য ডিবিটি লিঙ্ক ডাকঘরের মাধ্যমে মাত্র ৭৫ টাকায় ব্যাংকের সঙ্গে পরিচয়পত্র সংযুক্তিকরণের কাজ সুনিশ্চিত করার কথাও বলা হয়।
পরিদর্শনকালে জেলাশাসক লক্ষ্য করেন, উপযুক্ত পুষ্টির অভাবে এই জনজাতির মানুষদের শারীরিক অবস্থা বেশ দুর্বল। বিলম্ব না করে তিনি ভূপতি পল্লীতে একটি জরুরি স্বাস্থ্য শিবির করার এবং সেখান থেকে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণের নির্দেশ দেন।
এ ছাড়া, 'অন্নপূর্ণা যোজনা'র ফর্ম পূরণ করেও যাঁরা এখনো আর্থিক সুবিধা পাননি, তাঁদের একটি পৃথক তালিকা তৈরি করে দ্রুত জেলা দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ল্যাম্পস সমবায়ের মাধ্যমে বিরহোড়রা যাতে তাঁদের ন্যায্য অধিকার ও সুবিধা পান, তা দেখভাল করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্থানীয় বিডিওকে।
গ্রামবাসীদের আশ্বস্ত করার পাশাপাশি জেলাশাসক সুধীর কোন্থম তাঁদের উদ্দেশ্যে একটি মানবিক আবেদনও রাখেন। তিনি বলেন, এই প্রান্তিক জনজাতির জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকার যে সমস্ত পরিকাঠামো ও সম্পদ তৈরি করছে, তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় মানুষদেরই নিতে হবে। স্বয়ং জেলা শাসকের এমন ঘরের মানুষের মতো রূপ দেখে আপ্লুত ভূপতি পল্লীর বাসিন্দারা।