সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:
শরীর ও মনের মেলবন্ধন ঘটাতে বিশ্বজুড়ে পালিত হতে চলেছে ১২তম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস। এবারের যোগ দিবসের মূল কেন্দ্রবিন্দু বা ‘হোস্ট স্টেট’ পশ্চিমবঙ্গ এবং ‘হোস্ট সিটি’ কলকাতা। আগামী ২১শে জুন কলকাতার রেড রোডে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীসহ বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে আয়োজিত হতে চলেছে মেগা অনুষ্ঠান। সেই আবহেই কলকাতার সমান্তরালে যোগ উৎসবে মেতে উঠতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত জঙ্গলমহলের জেলা পুরুলিয়াও।
জেলাশাসক সুধীর কোন্থম জানান, "সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগব্যায়ামের শারীরিক ও মানসিক গুরুত্ব ছড়িয়ে দিতে এবং ভারতের এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে একগুচ্ছ অভিনব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন।
রবিবার ঠিক সকাল সাড়ে ৬টা থেকে জেলাজুড়ে শুরু হবে যোগাভ্যাস। ‘কমন যোগ প্রোটোকল’ মেনে এই কর্মসূচি চলবে ৪৫ মিনিট ধরে। পুরুলিয়া জেলার প্রধান অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হতে চলেছে পুরুলিয়া টাউনের এমএসএ স্টেডিয়ামে যেখানে প্রায় ৫০০ জন মানুষের যোগদানের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে"।
তিনি আরও বলেন, শুধু জেলা সদরই নয়, যোগের বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে একদম প্রান্তিক স্তরেও। রবিবার হওয়া সত্ত্বেও ওই দিন জেলার সমস্ত সরকারি অফিস, স্কুল এবং কলেজ খোলা থাকবে এবং ব্লক ও গ্রাম পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একযোগে যোগব্যায়াম করা হবে।
আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের কাউন্টডাউন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে পুরুলিয়ায়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত কয়েকদিনে ধাপে ধাপে চলেছে প্রস্তুতিমূলক শিবির।
সমাজের সব স্তরের মানুষকে জুড়তে সিনিয়র সিটিজেন, স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদের পাশাপাশি জেলার আপার ড্যাম এলাকায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে 'ইয়োগা ফর ট্রাইবালস' ।
মূল অনুষ্ঠানের আবহ তৈরি করতে আগামী ১৯শে জুন পুরুলিয়া টাউনের সার্কিট হাউস থেকে প্রায় ২ কিলোমিটারের একটি বিশেষ দৌড় ও ধ্যানের আয়োজন করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'রান ফর ইয়োগা: দৌড় সে ধ্যান'। এই দৌড়টি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।যোগ উৎসবের রেশ টেনেই আগামী ২০শে জুন পুরুলিয়ার রবীন্দ্র ভারতী অডিটোরিয়ামে উদযাপিত হবে 'পশ্চিমবঙ্গ দিবস'।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের এই সমস্ত কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার জন্য আন্তরিক আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে যাঁরা কোনো কারণে মূল অনুষ্ঠানস্থলে আসতে পারবেন না, তাঁরা যেন ওই দিন সকালে নিজের বাড়ির উঠোনে বা ছাদে পরিবারের সকলকে নিয়ে অন্তত ৪৫ মিনিট যোগাভ্যাস করেন।
আন্তর্জাতিক যোগা দিবস পালন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-র নেতৃত্বাধীন সরকারের ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত গুচ্ছ কর্মসূচির অন্যতম। সম্প্রতি সাংবাদিক সম্মেলনে এই ১২ বছরের উন্নয়ন, পরিকাঠামো, কৃষি, ডিজিটাল অর্থনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় নিরাপত্তা— একাধিক ক্ষেত্রে সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরল জেলা বিজেপি। দলের দাবি, গত এক দশকেরও বেশি সময়ে ভারত কেবল অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়নি, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিজেপির বক্তব্য, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল ‘রাষ্ট্র নির্মাণ’। সেই লক্ষ্যেই গ্রামীণ সড়ক, জাতীয় মহাসড়ক, রেল, বিমানবন্দর, ডিজিটাল পরিকাঠামো ও কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়েছে। দলের দাবি, গত ১২ বছরে গ্রামীণ এলাকায় প্রায় চার লক্ষ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ হয়েছে, যার ফলে বাজার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে গ্রামের সংযোগ অনেক সহজ হয়েছে।
কৃষিক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দাবি করেছে বিজেপি। তাদের বক্তব্য, খাদ্যশস্য উৎপাদন, দুগ্ধ উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের সম্প্রসারণের ফলে কৃষকদের আয় ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিঞ্চাই যোজনা’-র আওতায় বিপুল পরিমাণ জমি আধুনিক সেচ ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিজেপির দাবি, জাতীয় সড়কের দৈর্ঘ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি চেনাব সেতু, অটল টানেল ও নতুন পাম্বান সেতুর মতো প্রকল্প দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। রেল ক্ষেত্রেও বিদ্যুতায়ন, আধুনিকীকরণ এবং বন্দে ভারত ট্রেন পরিষেবার সম্প্রসারণকে সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ডিজিটাল ভারতের প্রসঙ্গও গুরুত্ব পেয়েছে বিজেপির প্রতিবেদনে। দলের দাবি, জনধন-আধার-মোবাইল এই ‘জ্যাম’ ত্রয়ীর মাধ্যমে সরকারি সুবিধা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ইউপিআই-ভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেন এবং ভারতনেট প্রকল্প গ্রামীণ এলাকাতেও ডিজিটাল পরিষেবার প্রসার ঘটিয়েছে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্যের দাবি করেছে বিজেপি। তাদের বক্তব্য, ভারত বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি এবং খুব শীঘ্রই তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির জায়গা দখল করবে। উৎপাদন ক্ষেত্র, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, মোবাইল ফোন উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা সামগ্রী রপ্তানিতে ভারতের অগ্রগতিকেও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
শুধু উন্নয়ন নয়, ‘বিশ্বাস’-কেও মোদী সরকারের ১২ বছরের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিজেপি। দলের মতে, টানা তিনবার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনই প্রমাণ করে যে দেশের মানুষ সরকারের নীতি ও কর্মসূচির উপর আস্থা রেখেছেন। কৃষক কল্যাণ, নারী ক্ষমতায়ন, জনজাতি সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের বিষয়গুলিও এই বিশ্বাসের ভিত্তি মজবুত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিজেপির বক্তব্য, অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ, কাশী বিশ্বনাথ করিডর, মহাকাল লোক প্রকল্প কিংবা ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিটি’-র মতো উদ্যোগ দেশের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে আরও দৃঢ় করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস, ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ এবং জি-২০ সম্মেলনের সফল আয়োজন বিশ্বমঞ্চে ভারতের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানকে দৃঢ় বলে উল্লেখ করেছে বিজেপি। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ এবং নকশাল দমনে সাফল্যের কথা তুলে ধরে দলের দাবি, দেশ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসী।
বিজেপির মতে, গত ১২ বছরের সবচেয়ে বড় অর্জন কেবল উন্নয়নমূলক প্রকল্প নয়, বরং সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সম্পর্ক গড়ে তোলা। সেই বিশ্বাস ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেই ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে বলে মনে করছে গেরুয়া শিবির।