শুভদীপ মাহাত, কাশিপুর
এখানকার দুর্গাপূজার বয়স প্রায় দু হাজার বছর। দ্বিতীয় শকাব্দে শুরু। এখন চলছে ১৯৪৮ শকাব্দ। মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নীর ধারনগরের রীতি মেনে জিতা অষ্টমীর পরের দিন আর্দ্রা নক্ষত্র যুক্ত কৃষ্ণ পক্ষের নবমীতে এই পুজো হয়ে আসছে। ১৬ দিনের পুজো ষোড়শ কল্পের পুজো বলে পরিচিত। স্থান পুরুলিয়ার পঞ্চকোট রাজপরিবারের শ্রী শ্রী রাজরাজেশ্বরী ঠাকুরদালান। রবিবার থেকেই শিখরবাসিনী দেবীর আরাধনা শুরু হয়েছে এখানে। পিতৃপক্ষেই মায়ের বোধন। ঢাকের বোল আর আগমনীর সুর সঙ্গে নিয়ে এক এক করে চন্ডীপাঠ, বলিদান, আরতি।
এই পুজোয় লুকানো রয়েছে দেবীর মন্ত্র। মায়ের আসন, এমনকি ভোগও গুপ্তভাবে রক্ষিত। মন্ত্র এতটাই গোপনীয় যে গাছের ছালে সংস্কৃত ও পালি ভাষায় ৯ টি পাতায় ৯ টি লাইন বাদ দিয়ে কোথাও কিচ্ছু লেখা নেই। রাজপরিবারের পুরোহিতের ওপর নাকি অভিশাপ, যে ওই গুপ্ত মন্ত্র সংরক্ষণ করতে গেলে ধ্বংস অনিবার্য। সংরক্ষণ করতে গিয়ে ফল পেয়েছে ওই রাজপরিবারের পুরোহিতের পরিবার।
মা শিখরবাসিনী দুর্গা এখানে চতুর্ভুজা অষ্টধাতুর তৈরি। এই পুজো শুরু করেন মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নীর ধারনগরের মহারাজা বিক্রমাদিত্যের বংশধর জগদ্দেও সিংহ-র কনিষ্ঠ পুত্র দামোদর শেখর। দামোদর শেখরের নামানুসারে এই বিস্তীর্ণ জঙ্গলমহলের নাম 'শেখরভূম' বা 'শিখরভূম। তাই এই দুর্গার নামও হয় শিখরবাসিনী দুর্গা।
পঞ্চকোট রাজপরিবার সদস্য সৌমেশ্বরলাল সিংহ দেও বলেন, "ধার নগরের মহারাজ জগৎদেউ সিংহের কনিষ্ঠ পুত্র দামোদর শেখর ২ শকাব্দে চাকলা পঞ্চকোট রাজ্য ও রাজবাড়ির দুর্গাপূজো প্রতিষ্ঠা করেন, যার ফলে এই অঞ্চল 'শেখরভূম' এবং ইষ্টদেবী 'শেখরবাসিনী দুর্গা' নামে পরিচিত হন। জিতাঅষ্টমীর পর কৃষ্ণপক্ষের নবমী থেকে শুরু হওয়া তাঁদের এই দুর্গে ১৬ দিনের অকালবোধন দুর্গাপূজোটি ভারতবর্ষের হাতে গোনা কয়েকটি বীরাচারী তন্ত্রমতের বিশেষ পূজোর একটি। শ্রুতিভিত্তিক গুপ্ত মন্ত্র যেমন 'সিংহনাদ মন্ত্র' পাঠ এবং দশমীতে সিঁদুরের ওপর দেবীর পদচিহ্ন দর্শন এই রাজবাড়ির ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। শ্রী শ্রী রাজরাজেশ্বরী মায়ের ১৬ দিনের বিশেষ ষোড়শকল্প পূজা মহাঅষ্টমী ও বীরাচারী তন্ত্রমতে বলিদান প্রথার মাধ্যমে শুরু হয়েছে। দেবী কল্যাণেশ্বরীর প্রতিমূর্তি রাজরাজেশ্বরীর এই পূজায় ঐতিহ্য মেনে দশমীর দিন বেলপাতা সরিয়ে মায়ের অলৌকিক পায়ের ছাপ দর্শন ও সিঁদুর গ্রহণের রীতি রয়েছে। পরিবার ও বনমালী পণ্ডিতের ৮৩ পুরুষের বংশানুক্রমিক ধারায় বর্তমানে পুরোহিত গৌতম চক্রবর্তীর পরিচালনায় এই ঐতিহ্যবাহী পূজা উদযাপিত হয়"।
পুজোর শুরুয়াত বনমালী পন্ডিতের হাত ধরে। ৮৩ পুরুষ ধরে তাঁরাই করে আসছেন এই ষোড়শ কল্পের পুজো। বর্তমানে গৌতম চক্রবর্তী এই পুজো করে থাকেন।
পুরোহিত গৌতম চক্রবর্তী বলেন,
"এখানে ১৬ দিন ধরে আগমনী গান, নৃত্য ও প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয় এবং বংশপরম্পরায় অষ্টমীর সন্ধিপূজায় বিশেষ শ্রীনাথ মন্ত্রপাঠ করা হয়। অষ্টমীর দিন রাজবাড়িতে মেয়ে ও বোনেদের 'খেওজাত' দেওয়ার পাশাপাশি মণ্ডপে মায়ের অলৌকিক পায়ের ছাপ পড়ে, যার ওপরের সিঁদুর দশমীতে ভক্তদের কল্যাণ কামনায় বণ্টন করা হয়। এছাড়া ভক্তরা রোগমুক্তি ও মনস্কামনা পূরণে হাঁড়িকাঠের সামনে জ্যান্ত চ্যাং মাছ উৎসর্গ করেন, যা মায়ের নিত্যভোগে ব্যবহৃত হয় এবং দশমী পর্যন্ত জ্যান্ত থাকে"।
সম্প্রতি কলকাতায় এসে বাগেশ্বর ধামের প্রমুখ ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী বাঙালিকে দুর্গাপূজায় নিরামিষ খাওয়ার নিদান দিয়ে গেছেন। শাস্ত্রীজি কি জানেন, দু হাজার বছর ধরে শিখরবাসিনী দেবীর গুপ্ত ভোগ ল্যাটা মাছ? সেই ভোগ কেবল গ্রহণ করবেন সেবাইত। এমনই নিয়ম এখানে।