নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:
যেখানে মানুষ-বন্যপ্রাণ সংঘাত প্রায় রোজকার খবর, সেখানে পুরুলিয়ার কোটশিলা ও ঝালদা বনাঞ্চল যেন অন্য এক গল্প লিখছে। হাতির দল, চিতাবাঘ, ভল্লুক কিংবা বিরল হানি ব্যাজার— জঙ্গলের এই বাসিন্দাদের শত্রু নয়, বরং আপনজন হিসেবেই আগলে রেখেছেন স্থানীয় মানুষ। সেই বিরল সহাবস্থানের স্বীকৃতি দিতেই এবার কোটশিলা-ঝালদা বনাঞ্চলকে ‘কনজারভেশন রিজার্ভ ফরেস্ট ’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব পৌঁছাল রাজ্য সরকারের দরবারে ।
সোমবার অরণ্য ভবনের পাশাপাশি পুরুলিয়ার জেলাশাসক সুধীর কোন্থমের কাছেও জমা পড়েছে প্রকল্পের বিস্তারিত রিপোর্ট (ডিপিআর)। বনদপ্তর সূত্রের খবর, জয়পুরের বিধায়ক বিশ্বজিৎ মাহাতোর সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ইতিবাচক ভূমিকার মূল্যায়ন করেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সবুজ সঙ্কেত মিললে গড় পঞ্চকোটের পরে এটিই হবে জেলার দ্বিতীয় কনজারভেশন রিজার্ভ ফরেস্ট ।
প্রস্তাবিত সংরক্ষিত অরণ্য এলাকার পরিধি প্রায় ৪,৩৮৩ হেক্টর। কোটশিলা ও ঝালদা-১ রেঞ্জের সিমনি, নোয়াহাতু এবং কলমা বিটের বিস্তীর্ণ বনভূমি এই প্রকল্পের আওতায় আসবে। বিধায়ক বিশ্বজিৎ মাহাতোর কথায়, ‘‘এই বনাঞ্চল আমাদের অমূল্য সম্পদ। জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে একে সংরক্ষণ করা জরুরি। বনদপ্তরের এই প্রস্তাবে রাজ্য দ্রুত অনুমোদন দেবে বলেই আশা করছি।’’
ঝাড়খণ্ড সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চল গত কয়েক বছরে বনকর্তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পালামৌ থেকে ঘুরে আসা বাঘিনী ‘জিনাত’-এর বয়ফ্রেন্ড বাঘ 'কিলা'র উপস্থিতি সেই আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়। বনদপ্তরের একাংশের মতে, জীববৈচিত্র্যের বিচারে এই এলাকা গড় পঞ্চকোটের চেয়েও সমৃদ্ধ। তাই দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল।
ডিপিআরে চারটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, বন্যপ্রাণ সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। থার্মাল ড্রোন, নাইট ভিশন ড্রোন, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ওয়াচ টাওয়ার এবং একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রস্তাব করা হয়েছে ঔষধি গাছের বিশেষ বনাঞ্চল গড়ে তোলার। বনদপ্তরের ধারণা, বন্যপ্রাণীরা চলাচলের সময় এই গাছের সংস্পর্শে এসে প্রাকৃতিক উপায়ে কিছু রোগ থেকে উপকৃত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, জঙ্গল লাগোয়া গ্রামগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন। কমিউনিটি হল, রাস্তা এবং সৌরবাতির ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। তৃতীয়ত, স্থানীয়দের আয়ের নতুন পথ খুলতে হোম-স্টে, ইকো-ট্যুরিজম, ভেষজ বাগান এবং পাখি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। চতুর্থত, লাক্ষা-সহ বিভিন্ন বনজ চাষে আধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বনদপ্তরের মতে, সংরক্ষণ তখনই সফল হবে, যখন তার সুফল স্থানীয় মানুষের জীবনেও পৌঁছবে। তাই প্রকল্পের মূল দর্শন— ‘বন্যপ্রাণ রক্ষা ও জীবিকার উন্নয়ন, দু’টিই একসঙ্গে’।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রচার চালানো হবে। থাকবে স্বাগত তোরণ ও তথ্যসমৃদ্ধ হোর্ডিং।
বনদপ্তরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘এই এলাকার মানুষ বহুদিন ধরেই বন্যপ্রাণের প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকা পালন করছেন। কনজারভেশন রিজার্ভ হলে সেই সম্পর্ক আরও মজবুত হবে।’’
সব মিলিয়ে, কোটশিলার জঙ্গলে সংরক্ষণের নতুন এই ভাবনা শুধু প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয় নয়, মানুষের উন্নয়নেরও এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কনজারভেশন রিজার্ভ ফরেস্ট কী?
▪️ বন্যপ্রাণ ও তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণের জন্য ঘোষিত বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা।
▪️ ভারতের বন্যপ্রাণ সুরক্ষা আইন, ১৯৭২-এর ২০০২ সালের সংশোধনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থার সূচনা।
▪️ জাতীয় উদ্যান বা অভয়ারণ্যের তুলনায় এখানে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বেশি।
▪️ গ্রামবাসীদের ঐতিহ্যগত ও বৈধ অধিকার সাধারণত বজায় থাকে।
▪️ বনদপ্তর এবং স্থানীয় মানুষের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
▪️ বন্যপ্রাণীর চলাচলের করিডর ও গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
▪️ মানুষ ও বন্যপ্রাণের সহাবস্থান নিশ্চিত করাই এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
▪️ সংরক্ষণের পাশাপাশি ইকো-ট্যুরিজম, হোম-স্টে, বনজ সম্পদভিত্তিক জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে।
▪️ কোটশিলা-ঝালদা এলাকায় প্রস্তাবিত কনজারভেশন রিজার্ভের আয়তন প্রায় ৪,৩৮৩ হেক্টর।
▪️ এই এলাকায় হাতি, চিতাবাঘ, ভল্লুক, হানি ব্যাজার-সহ বহু বন্যপ্রাণের বাস ও চলাচল রয়েছে।
▪️ প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে গড় পঞ্চকোটের পর এটি হবে পুরুলিয়া জেলার দ্বিতীয় কনজারভেশন রিজার্ভ।
▪️ মূল লক্ষ্য হলো বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ, স্থানীয় মানুষের উন্নয়ন এবং মানুষ-বন্যপ্রাণের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা।