রাজনীতি

ছড়রায় বিমানবন্দর, মেডিক্যাল কলেজে সুপার স্পেশালিটি, বাজেটে গুচ্ছ উপহার পুরুলিয়াকে

রাজ্য বাজেটে পুরুলিয়ার প্রাপ্তি— ▪️ছড়রায় বিমানবন্দর। ▪️সদর হাসপাতালকে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে রূপান্তরকরণ। ▪️সাঁওতালডিতে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন ইউনিট। ▪️কুড়মিদের উন্নয়নে ৫০ কোটি। ▪️পিএম অজয় গ্রামগুলিকে 'আদর্শ গ্রাম' হিসেবে গড়ে তুলতে ৫০০ কোটি টাকা ▪️তিনটি বিশেষ আর্থিকভাবে দুর্বল আদিবাসী গোষ্ঠী লোধা-শবর, টোটো এবং বিরহোড় সম্প্রদায়ের খাদ্য নিরাপত্তা।
ছড়রায় বিমানবন্দর, মেডিক্যাল কলেজে সুপার স্পেশালিটি, বাজেটে গুচ্ছ উপহার পুরুলিয়াকে

 

নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবাহী ছড়রার পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপে বিমানবন্দর গড়ার প্রকল্পে সবুজ সঙ্কেত দিল রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। একই সঙ্গে পুরুলিয়া দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের শহরের বাসস্ট্যান্ড ক্যাম্পাসকে পৃথক করে পূর্ণাঙ্গ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরির ঘোষণাও করা হয়েছে সোমবার বিধানসভায় পেশ হওয়া রাজ্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে।সঙ্গে সাঁওতালডি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৮০০ মেগাওয়াট নতুন ইউনিট পিপিপি মডেলে। ফলে একদিনে পরিকাঠামো ও স্বাস্থ্য— দুই ক্ষেত্রেই বড় প্রাপ্তি পেল পুরুলিয়া।

রাজ্য বাজেট পেশের সময় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সামনে দাঁড়িয়ে  অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত জানান, পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ছড়রায় আঞ্চলিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করা হবে। পাশাপাশি পুরুলিয়া শহরের বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসকে আধুনিক সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে উন্নীত করার জন্য পৃথক বরাদ্দও রাখা হয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্রের খবর, বাজেট ঘোষণার আগে পুরুলিয়ার বিজেপি বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জেলার উন্নয়ন সংক্রান্ত একাধিক প্রস্তাব জমা দেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল ছড়রা বিমানবন্দর প্রকল্প ও সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল গঠন। সেই দুই দাবিকেই বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ছড়রার বিমানবন্দর প্রকল্পের স্বপ্ন জেলাবাসীর কাছে নতুন নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে রাজ্যের বিভিন্ন দপ্তর, এয়ারপোর্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া এবং প্রকল্প রূপায়ণকারী সংস্থা রাইটস যৌথভাবে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছিল। তখন রানওয়ের পূর্ব দিকে হাইটেনশন বিদ্যুৎ লাইন, পশ্চিম দিকে রেললাইন, অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ, ১১ নম্বর ব্যাটেলিয়ন ক্যাম্পাস স্থানান্তর-সহ একাধিক জটিলতার কথা সামনে আসে। সেই কারণে প্রকল্পটি কার্যত থমকে ছিল।

প্রস্তাবিত বিমানবন্দরটি কেন্দ্রের ‘উড়ান’ প্রকল্পের আওতায় গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ১১০০ মিটার রানওয়ে তৈরি করা হবে। ভবিষ্যতে তা ১৭০০ মিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হচ্ছে। পর্যাপ্ত পরিকাঠামো তৈরি হলে ৪২ আসনের বিমান ওঠানামাও সম্ভব হবে বলে পূর্ববর্তী কারিগরি সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছিল।

বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ফ্লাইট ট্রেনিং অর্গানাইজেশন (এফটিও) গড়ার পরিকল্পনাও। বিমান চলাচলের পাশাপাশি পাইলট প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবেও ছড়রাকে গড়ে তোলার ভাবনা রয়েছে সরকারের।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য। বর্তমানে পুরুলিয়া দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মূল ক্যাম্পাস হাতোয়াড়ায়, যা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। শহরের বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন পুরনো ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বিভাগ চালু থাকলেও পূর্ণাঙ্গ সুপার স্পেশালিটি পরিষেবা নেই। বাজেট ঘোষণার পর ওই ক্যাম্পাসকে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোয় উন্নীত করে আধুনিক সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরির পথ প্রশস্ত হল।

স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, হৃদরোগ, স্নায়ুরোগ, কিডনি, ক্যানসার এবং ট্রমা কেয়ারের মতো বিশেষায়িত বিভাগ চালুর প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফলে কলকাতা বা অন্য জেলায় রেফার হওয়া রোগীর সংখ্যা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে কুড়মালি ভাষা, কুড়মি অ্যাকাডেমি ও কুড়মি লোকশিল্পীদের উন্নয়নের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বাজেটে।

পাশাপাশি একেবারে তফশিলি ও উপজাতি অধ্যুষিত গ্রামগুলির দিকেও নজর বাজেটে। পুরুলিয়ার পিছিয়ে পড়া এই সব গ্রামেও ডবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে চালু হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প পিএম অজয়। এই প্রকল্পে ওই গ্রামগুলিকে 'আদর্শ গ্রাম' হিসেবে গড়ে তুলতে  ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। জেলার বিলুপ্ত প্রায় জনজাতি বিরহোড় অধ্যুষিত গ্রামগুলিও রয়েছে এই তালিকায়। শুধু তাই নয়, বাজেটে পশ্চিমবঙ্গে সরকার স্বীকৃত তিনটি বিশেষ আর্থিকভাবে দুর্বল আদিবাসী গোষ্ঠী লোধা-শবর, টোটো এবং বিরহোড় সম্প্রদায়ের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, তাদের জন্য সুষম পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাদ্য বিতরণের একটি প্রকল্প ঘোষণা করা হয়। এর মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে এই আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির প্রত্যেকটি পরিবারকে রেশন বরাদ্দের পাশাপাশি  চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, নুন এবং আলু-সহ খাদ্য প্যাকেট বিতরণ করা হবে।

জেলার বাসিন্দা তথা রাজ্যের বিশিষ্ট শিল্পপতি নরেশ আগরওয়াল বলেন, " পুরুলিয়ায় বৃহৎ শিল্প স্থাপনের জন্য যা যা পরিকাঠামো প্রয়োজন, সবই ছিল। শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল দুর্বল। নতুন সরকারের এই উদ্যোগ এই দুর্বলতা কাটিয়ে তুলবে। পাশাপাশি পর্যটনে জোয়ার আসবে। চিকিৎসার কারণে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবহারও সহজ হবে। রাজ্যের নতুন সরকার ও নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে পুরুলিয়া বাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। "

চেম্বার অফ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক রাজেশ সিংঘানিয়া বলেন, " আমাদের সংগঠন বারে বারে সরকারের কাছে ছড়রায় বিমানবন্দর চালু করার দাবি জানিয়ে এসেছে। নতুন সরকার এসেই সেই দাবি পূরণ করায় আমরা আনন্দিত।"

ছড়রায় বিমানবন্দর স্থাপনের সিদ্ধান্তে যে পুরুলিয়ার রূপ বদলে যাবে সেই কথা ব্যক্ত করেছেন ওয়েস্ট বেঙ্গল রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারি মনোজ ফোগলা।

একদিকে বিমানবন্দর, অন্যদিকে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, পাশাপাশি সাঁওতালডির ৮০০ মেগাওয়াটের নতুন ইউনিট এই তিন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পুরুলিয়ার অর্থনীতি, পর্যটন, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলবে বলে মনে করছেন প্রশাসনিক মহল। বহুদিনের দুই দাবি বাজেটে স্থান পাওয়ায় জেলায় খুশির হাওয়া। এখন নজর প্রকল্পগুলির দ্রুত রূপায়ণের দিকে।