নিজস্ব প্রতিনিধি, বাঘমুন্ডি :
বিছানায় মায়ের পাশে ঘুমিয়ে ছিল দেড় বছরের শিশু। ভোরে মায়ের ঘুম ভাঙতেই দেখা যায়, পাশে নেই সন্তান। কিছু ক্ষণের মধ্যেই বাড়ির কুয়ো থেকে উদ্ধার হয় তার নিথর দেহ। পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডির চানো গ্রামের সেই ঘটনায় এ বার তদন্তের অভিমুখে নতুন প্রশ্ন। ধৃত ঠাকুরদার ঘর থেকে একটি ধাতব যন্ত্র উদ্ধারের পর সম্ভাব্য তন্ত্রসাধনার যোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
গত ২৯ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনায় শনিবার নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়ায়। পুলিশ সূত্রে খবর, উদ্ধার হওয়া ধাতব যন্ত্রটি তন্ত্রসাধনায় ব্যবহৃত হয় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে যন্ত্রটির পরিচয় নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ পুলিশ। তবে এই সূত্র ধরে পরিবারের অতীত ও পারিবারিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
পুলিশ সূত্রের খবর, মৃত শিশুর মা লক্ষ্মী প্রামাণিকের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথমে প্রতিবেশী ফুলচাঁদ প্রামাণিককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পুরনো বিবাদের জেরে তিনি এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন বলে অভিযোগ। ফুলচাঁদ অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে তদন্তে প্রশিক্ষিত কুকুরের গতিবিধি এবং অন্যান্য সূত্রের ভিত্তিতে শিশুটির ঠাকুরদা রাজেন্দ্রনাথ প্রামাণিকের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শিশুটির ঠাকুমাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের নজরে এসেছে, ওই পরিবারের সঙ্গে তন্ত্রসাধনার যোগ রয়েছে বলে কিছু তথ্য মিলেছে। পরিবারে একাধিক শিশুর অতীতে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ধন্দে রেখেছে তদন্তকারীদের।
প্রথম দিকে তদন্তকারীদের ধারণা ছিল, শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা যায়, জীবিত অবস্থাতেই তাকে কুয়োয় ফেলা হয়েছিল। সেই তথ্যের পর থেকেই তদন্তে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে গভীর রাতে বা ভোরে অত ছোট্ট শিশুটি কী ভাবে বাড়ির বাইরে কুয়োর কাছে পৌঁছাল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
শিশুটির মায়ের বয়ান অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বর ভোর চারটে নাগাদ তার দাদু দরজা খুলে গোয়ালঘরে গিয়েছিলেন। সেই সময় ঘুম ভেঙে মায়ের নজরে আসে, বিছানায় সন্তান নেই। খোঁজাখুঁজির পর এলাকার এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে বাড়ির কুয়ো থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে পাথরডি ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এই ঘটনার সঙ্গে ফের উঠে এসেছে ২০১৭ সালের পুরুলিয়ার বহুচর্চিত ‘সূচ-কাণ্ড’-র স্মৃতি। পুরুলিয়া মফস্বল থানার নদিয়াড়া গ্রামে তিন বছরের এক শিশুকন্যার শরীরে সূচ ফুটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠেছিল গ্রামের বাসিন্দা সনাতন ঠাকুর এবং শিশুটির মা মঙ্গলা গোস্বামী বিরুদ্ধে। সেই ঘটনাতেও তন্ত্রসাধনার প্রসঙ্গ সামনে এসেছিল। প্রায় ন’বছর পর বাঘমুণ্ডির শিশুমৃত্যুর তদন্তে সেই ভয়ানক স্মৃতি যেন ফিরিয়ে দিলো।
কুসংস্কার, পারিবারিক বিবাদ, না কি অন্য কোনও কারণ— দেড় বছরের শিশুটির মৃত্যুর পিছনে ঠিক কী রয়েছে, তার উত্তর মেলেনি এখনও।