সাধারণ খবর পর্যটন অন্যান্য ব্লক

জানেন কি, পুরুলিয়ায় ভূতের ভয়ে জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল আস্ত একটা গ্রাম?

মানভুঁইয়া বাংলায় কালহা মানে শীতল। আর গ্রামের নাম শুনলেই কেমন যেন বুক ঢিপ ঢিপ করে। পিচ রাস্তা দিয়ে হাঁটলে দিনের বেলাতেও মনে হয় কেউ যেন পিছু নিয়েছে! শিরদাঁড়া দিয়ে যেন বয়ে যায় একটা হিমশীতল স্রোত। প্রায় ৫ দশক আগে স্রেফ ভূতের আতঙ্কে আস্ত এই গ্রাম খালি হয়ে গিয়েছিল।
জানেন কি, পুরুলিয়ায় ভূতের ভয়ে জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল আস্ত একটা গ্রাম?

 

সুইটি চন্দ্র, অযোধ্যা পাহাড়:

পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি ব্লকের  অযোধ্যা হিলটপ থেকে মুরগুমা যাওয়ার রাস্তায় ডান দিকে ময়ূর পাহাড়। তারপর বেশ কিছুটা গিয়ে বাঁ হাতে কালহা গ্রামের রাস্তা। সেই রাস্তা ধরতেই ডানদিকে ওই সড়ক নির্মাণে পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদের বোর্ড। সেখানে লেখা গ্রামের নাম। জঙ্গলের বুক চিরে যে পিচ রাস্তা চলে গিয়েছে সেই পথ-ই কালহা। মানভুঁইয়া বাংলায় কালহা মানে শীতল। আর গ্রামের নাম শুনলেই কেমন যেন বুক ঢিপ ঢিপ করে। পিচ রাস্তা দিয়ে হাঁটলে দিনের বেলাতেও মনে হয় কেউ যেন পিছু নিয়েছে! শিরদাঁড়া দিয়ে যেন বয়ে যায় একটা হিমশীতল স্রোত। প্রায় ৫ দশক আগে স্রেফ ভূতের আতঙ্কে আস্ত এই গ্রাম খালি হয়ে গিয়েছিল।

আজও গ্রামে পা রাখলে গা ছমছম করে। কাঁটা দিয়ে ওঠে সারা শরীর।
দিনের বেলাতেও। এখন যে গ্রামে মাত্র হাতে গোনা ১০ থেকে ১২ টি পরিবার।
তাই গ্রাম একেবারেই শুনশান। মাঝে মধ্যে কেউ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়। আবার কেউ বাইকে বা সাইকেলে। সন্ধ্যা নামলেই ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে চলে যায় পাখি। রাতে দেখা মেলে বাদুড়ও। সন্ধ্যাতেই যেন রাত নেমে আসে এখানে। আর রাত? যেন মনে হয় শ্মশানের নিস্তব্ধতা।

গ্রামের মানুষজন কোন কথাই বলতে চান না।  ছবি,ভিডিও করতে গেলে অসন্তোষ ধরা পড়ে। নিজেদের মুখ লুকিয়ে নেন। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই জানেন, প্রায় ৫ দশক আগে ভূতের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু মুখে সেই ঘটনা বলতে চান না।
কেউ কেউ বলেন শুনেছি। তবে বেশিরভাগজনই বলে থাকেন, "নাই জানি!"

এই আতঙ্কের বাজারে পাওয়া গেল কালহা গ্ৰামের বাসিন্দা দীনেশ মান্ডিকে। তিনি বলেন,"গ্রামে একসময় ভূতের তীব্র আতঙ্ক থাকলেও বর্তমানে সেই পরিস্থিতি আগের চেয়ে কিছুটা ভালো হয়েছে।
অতীতে মানুষ কম থাকলেও এখন লোকজন বসবাস শুরু করেছে এবং কিছু ছোটখাটো দোকানপত্র গড়ে উঠেছে। ভূতের আতঙ্ক ছাড়া গ্রামের বাকি অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি "।

প্রায় ৫  দশক আগেকার কথা। কোন রোগ অসুখে বাঘমুন্ডির এই গ্রামে দেখা দিয়েছিল মড়ক। একের পর এক মৃত্যুতে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল গ্রামে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে মাস ছয়েকের মধ্যেই এই গ্রাম হয়ে গিয়েছিল জনশূন্য। ৪০ থেকে ৪৫ টি পরিবার অযোধ্যা হিলটপের খেড়ঘুটু, দুমদুমি সহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। একেবারেই ভিটেমাটি ছেড়ে স্রেফ ভূতের আতঙ্কে। মড়কের পর নাকি নানান অলৌকিক ঘটনা ঘটতো ওই গ্রামে।

পুরুলিয়া জেলা বিজ্ঞান মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক‌ নয়ন মুখোপাধ্যায়  বলেন,
"অযোধ্যা পাহাড়ের কাছে কালহা গ্রামের আদিবাসীরা অতীতে এক যুবতীর আত্মহত্যা এবং মড়কজনিত অন্ধবিশ্বাসের আতঙ্কে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। পরবর্তীকালে সেখানে কোনো অস্বাভাবিকতা বা অশরীরী আত্মার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এটি সম্পূর্ণ একটি অমূলক আতঙ্ক মাত্র। ভূত চতুর্দশীতে এই ধরনের "ঘোস্ট ট্যুরিজম" ও কুসংস্কারের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই"।

তিনি আরও বলেন, "বিজ্ঞান মঞ্চের পক্ষ থেকে গত দশ বছর ধরে ঘোষণা করা হয়েছে যে, কেউ যদি ভূত বা অলৌকিক ঘটনার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দিতে পারে, তবে তাকে ৫ লক্ষ টাকা পুরস্কৃত করা হবে।"
অন্যদিকে ভারতীয় বিজ্ঞান যুক্তিবাদী সমিতি তেমনটা করে দেখাতে পারলে ইনাম দেবে ৫০ লক্ষ টাকা। এর আগে ঝালদা ২ নং ব্লকের বেগুনকোদর স্টেশন এবং হুড়ার অর্জুনজোড়া জঙ্গলে গিয়ে তারা প্রমাণ করেছেন যে ভূতের অস্তিত্ব বলে কিছু নেই, বরং এগুলো মানুষের ভীতি ও গুজবের ফল। ভূত চতুর্দশীর সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু চক্র মানুষের আতঙ্ক ও কুসংস্কারকে পুঁজি করে ব্যবসা ও প্রতারণাচক্র চালায়, যার বিরুদ্ধে সমাজমাধ্যমে ও বাস্তবে তাদের এই সচেতনতামূলক আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।

দীর্ঘদিন এই গ্রামে কোন জনবসতি না থাকার পর ধীরে ধীরে এই গ্রামে মানুষজন ফিরতে শুরু করেন। শুরু হয় চাষাবাদ। প্রায় ১২ বছর আগে এই গ্রামের এক মহিলা দাম্পত্য কলহে কূল গাছে গলায় দড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। তারপর আবার গ্রাম ছাড়েন মানুষজন। তখন গ্রামে ছিল প্রায় ২০-২৫টি পরিবার। এখন তা আরও কমে গিয়েছে। তবে গ্রামে হয়েছে রিসর্ট, স্কুল। ভূত দেখার অ্যাডভেঞ্চারে অংশ নিতে বহু পর্যটক এখানে পা রাখেন।

অযোধ্যা হিলটপ-র একটি হোটেলের ম্যানেজার প্রদীপকুমার রায় বলেন, "বর্ষার মরসুম ছাড়াও পুরুলিয়ায় পর্যটকদের মধ্যে 'ঘোস্ট টুরিজম' বা ভূত বিষয়ক স্থানগুলি নিয়ে প্রবল উৎসাহ ও কৌতুহল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বেগুনকোদর রেলওয়ে স্টেশন ছাড়াও কালহা গ্রামের ৫০-৬০ বছরের পুরনো ভৌতিক ইতিহাস পর্যটকদের আকর্ষণ করছে"।
ভূত বলে সত্যিই কিছু নেই। সবই কুসংস্কার। কিন্তু গ্রামের পরিবেশটাই যেন ভয় ধরানো, ভুতুড়ে। সে নিয়ে সন্দেহ নেই কারও। আতঙ্কই যেন সেই পরিবেশের প্রধান উপাদান।