সুজয় দত্ত
duttasujoy0@gmail.com
সুজয় দত্ত
বাংলার ঐতিহ্যের মুকুটে জুড়ল আরও এক পালক। ভারত সরকারের জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) নিবন্ধনে স্থান পেল 'পুরুলিয়ার লাক্ষা'। এই স্বীকৃতিকে ঘিরে খুশির হাওয়া বলরামপুর-সহ জেলার লাক্ষা উৎপাদক, শিল্পী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তাঁদের আশা, জিআই ট্যাগের হাত ধরে এবার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে আরও স্বতন্ত্র পরিচিতি পাবে পুরুলিয়ার লাক্ষা। একই সঙ্গে বাড়বে চাহিদা ও দাম, যার সুফল মিলবে হাজার হাজার লাক্ষা-নির্ভর পরিবারের।
শুক্রবার ভারত সরকারের জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন নিবন্ধনে বাংলার ১২টি নতুন ঐতিহ্যবাহী পণ্য জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই তালিকাতেই রয়েছে 'পুরুলিয়ার লাক্ষা'। পাশাপাশি জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে চন্দননগরের জলভরা, জনাইয়ের মনোহরা, শান্তিনিকেতনের বাটিক, একতারা, বেলিয়াতোড়ের মেচা সন্দেশ, মুর্শিদাবাদের সিল্ক-সহ একাধিক ঐতিহ্যবাহী পণ্য। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই স্বীকৃতি শুধু পণ্যের স্বাতন্ত্র্যকেই আইনগত সুরক্ষা দেবে না, বরং স্থানীয় শিল্পী ও উৎপাদকদের বাজার সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সুযোগও তৈরি করবে।
পুরুলিয়ার বলরামপুর, বাঘমুণ্ডি, ঝালদা-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কুসুম, পলাশ ও বরই গাছে লাক্ষা চাষ হয়ে আসছে। বিশেষ জলবায়ু, বনাঞ্চল এবং স্থানীয় মানুষের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে এখানকার উৎপাদিত লাক্ষার গুণগত মান দেশের অন্যতম সেরা বলে পরিচিত। সেই ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যেরই স্বীকৃতি মিলল জিআই ট্যাগের মাধ্যমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিআই স্বীকৃতির ফলে 'পুরুলিয়ার লাক্ষা' এখন একটি আইনগতভাবে সুরক্ষিত ভৌগোলিক পরিচয়। ফলে অন্য অঞ্চলের উৎপাদিত লাক্ষাকে এই নামে বাজারজাত করা যাবে না। এতে নকল পণ্যের দৌরাত্ম্য কমবে এবং প্রকৃত উৎপাদকরা ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
লাক্ষা থেকে তৈরি হয় বার্নিশ, সিলিং ওয়াক্স, প্রসাধনী, ওষুধ, খাদ্য শিল্পে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক আবরণ এবং বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের সামগ্রী। পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক এই কাঁচামালের আন্তর্জাতিক বাজারেও চাহিদা বাড়ছে। ফলে জিআই স্বীকৃতি রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বলরামপুরের বহু আদিবাসী ও প্রান্তিক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম লাক্ষা চাষ ও সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত। কৃষিকাজের পাশাপাশি এই শিল্পই তাঁদের অন্যতম আয়ের উৎস। তবে বাজারে দামের ওঠানামা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং যথাযথ ব্র্যান্ডিংয়ের অভাবে এতদিন প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হতেন তাঁরা। জিআই ট্যাগ সেই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে বলেই আশাবাদী উৎপাদকরা।
জেলা প্রশাসন ও শিল্প মহলের আশা, এই স্বীকৃতির পর শুধু উৎপাদন নয়, ব্র্যান্ডিং, মূল্য সংযোজন, আধুনিক বিপণন এবং রপ্তানির দিকেও নতুন করে জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি লাক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত চাষি ও কারিগরদের প্রশিক্ষণ এবং সরকারি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
বাঁকুড়ার টেরাকোটা, দার্জিলিংয়ের চা কিংবা মুর্শিদাবাদের সিল্কের মতোই এবার দেশের জিআই মানচিত্রে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করল পুরুলিয়ার লাক্ষা। বহু প্রাচীন এই বনজ শিল্পের সামনে তাই খুলে গেল সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত।
Disclaimer:
এই প্রবন্ধটি অতিথি লেখক সুজয় দত্ত -এর রচনা। এতে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব এবং তা Purulia Mirror-এর মতামত বা অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না। এই লেখায় উল্লিখিত তথ্যসমূহ Purulia Mirror স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করেনি এবং এর বিষয়বস্তুর জন্য পত্রিকা কোনো দায়ভার গ্রহণ করে না। এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন বা আপত্তি থাকলে অনুগ্রহ করে সরাসরি লেখকের সঙ্গে duttasujoy0@gmail.com -এ যোগাযোগ করুন।