নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:
অতীতের সমস্ত বঞ্চনা ও খাদ্য সঙ্কটের স্থায়ী ইতি টানতে জঙ্গলমহলের প্রান্তিক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। শুক্রবার পুরুলিয়া জেলার মাঠা মাল্টিপারপাস হলে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলো পিভিটিজি (বিশেষভাবে দুর্বল জনজাতি গোষ্ঠী )
গোষ্ঠীদের জন্য বিশেষ পুষ্টিকর খাদ্য প্যাকেট বিতরণ প্রকল্প। এদিনের এই প্রকল্পটির সূচনা করেন রাজ্যের রাষ্ট্রমন্ত্রী নদীয়ার চাঁদ বাউরি, জেলাশাসক সুধীর কোন্তম সহ বিশিষ্ট জন প্রতিনিধিরা।
রাজ্য বাজেটে ঘোষিত এই জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো, লোধা-শবর, বিরহোড় এবং টোটো— এই তিন প্রান্তিক জনজাতির প্রতিটি পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা এবং সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করা। অতীতে জঙ্গলমহলের কিছু এলাকায় অপুষ্টিজনিত সমস্যার যে ভয়ানক চিত্র তৈরি হয়েছিল, তার যাতে আর কখনও পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজ্য প্রশাসন। এই বিশেষ প্যাকেজের ফলে এখন থেকে আর ক্ষুধার জ্বালা ভুগতে হবে না এই জনজাতিগুলির কোনো পরিবারকে।
চলতি প্রকল্প অনুযায়ী, উপভোক্তাদের পরিবারগুলিকে বয়স ও প্রয়োজনভেদে সুষম পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাদ্যসামগ্রী প্রদান করা হচ্ছে। ৬ বছরের ঊর্ধ্বে বেনিফিশিয়ারিদের জন্য,প্রতি প্যাকেজে থাকছে ২ কেজি চিড়া, ১ কেজি ছোলা, ১ কেজি মুগ ডাল, ৩০০ গ্রাম সয়াবিন, ৩০০ গ্রাম বাদাম, ১.৫ কেজি গুড় এবং ৫০০ গ্রাম সরিষার তেল।
৬বছরের নিচে বেনিফিশিয়ারিদের জন্য,প্রতি প্যাকেজে থাকছে ১ কেজি চিড়ে, ৫০০ গ্রাম মুগ ডাল, ১৫০ গ্রাম সয়াবিন, ১৫০ গ্রাম বাদাম, ৫০০ গ্রাম গুড় এবং ৩০০ গ্রাম সরিষার তেল।
এছাড়াও, এদিনের এই বিশেষ অনুষ্ঠানে একটি স্বাস্থ্য শিবিরেরও করা হয়, যেখান থেকে উপস্থিত বহু উপভোক্তা বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা গ্রহণ করেন।
কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাভুক্ত পিভিটিজি বা ‘পার্টিকুলারলি ভালনারেবল ট্রাইবাল গ্রুপ’-এর অন্তর্ভুক্ত এই বিরহোড় ও টোটো জনজাতিগুলি আজ ক্রমশ লুপ্তপ্রায়। ক্যুইজ বা সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে যাদের নাম পাওয়া যায়, সেই বিরহোড় জনজাতির মানুষের বসবাস প্রধানত পুরুলিয়ার বলরামপুর, বাঘমুন্ডি এবং ঝালদা-১ ব্লকের হাতে গোণা কয়েকটি গ্রামে। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার ভুটান সীমান্ত সংলগ্ন টোটোপাড়া গ্রামে বসবাস করেন টোটো জনজাতিরা।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ‘প্রোটো অস্ট্রোলয়েড’ জাতিভুক্ত এই জনজাতিগুলি অত্যন্ত অরণ্যনির্ভর। সরকার তাদের জন্য পাকা বাড়ির ব্যবস্থা করলেও তাদের আদিম সংস্কৃতির শিকড় এখনও বনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এছাড়াও খেড়িয়া শবর ও লোধা শবরদের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। ব্রিটিশ আমলে 'ক্রিমিনাল ট্রাইব অ্যাক্ট'-এর মতো দমনপীড়নের শিকার হতে হলেও এবং স্বাধীনতার পরেও বনের অধিকার নিয়ে নানা দীর্ঘ লড়াই লড়তে হলেও, আজ রাজ্য সরকারের এই বিশেষ পুষ্টি প্রকল্পের হাত ধরে তাদের জীবনে এক নতুন সূর্যোদয় ঘটল।
৩ জনজাতির জনসংখ্যাও দ্রুত কমছে। রাজ্যে বিরহোড় রয়েছেন প্রায় ৩০০, টোটো প্রায় ১৭০০,শবর -(খেড়িয়া শবর)১৪,০৪০, (লোধা শবর) ১ লাখের বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জনজাতির মানুষরা দীর্ঘকাল ধরে জীবন সংগ্রামে পিছিয়ে ছিলেন। তাদের নিজস্ব জীবিকা ও আয়ের স্থায়ী সংস্থান না থাকায় পুষ্টিহীনতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে রাজ্য সরকারের এই বিশেষ পুষ্টি প্রকল্প, পিএম-অজয় প্রকল্পের আওতায় ‘আদর্শ গ্রাম’ গড়ার উদ্যোগ এবং সর্বোপরি সার্বিক উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের ফলে প্রান্তিক জনজাতিগুলির জীবনে আমূল পরিবর্তন আসবে। বাঘমুন্ডির বিরহোড় গ্রামের বাসিন্দা কাঞ্চন শিকারির কথায়, "এই খাদ্য প্যাকেজ আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া জনজাতিদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে খাবারের আর কোনো অভাব থাকবে না।"