শিক্ষা ব্লক

রেকর্ড গড়লো পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন, উচ্চ মাধ্যমিক মেধা তালিকায় বিদ্যাপীঠের ১৭ ছাত্র

সম্ভবত এই প্রথম রাজ্যের মোট ৬৪ জন কৃতি ছাত্রের মধ্যে ১৭ জন একই বিদ্যালয়ের। মিশনের আধ্যাত্মিক পরিবেশ, কঠোর শৃঙ্খলা এবং গুরু-শিষ্যের নিবিড় সম্পর্কের ফলেই এই অভাবনীয় সাফল্য বলে মনে করছে শিক্ষা মহল।
রেকর্ড গড়লো পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন, উচ্চ মাধ্যমিক মেধা তালিকায় বিদ্যাপীঠের ১৭ ছাত্র

সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:


মাধ্যমিকের পর এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাতেও সাফল্যের ধারায় পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠ। রাজ্যের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ প্রকাশিত মেধা তালিকায় জয়জয়কার এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠের। সম্ভবত এই প্রথম রাজ্যের মোট ৬৪ জন কৃতি ছাত্রের মধ্যে ১৭ জন একই বিদ্যালয়ের। মিশনের আধ্যাত্মিক পরিবেশ, কঠোর শৃঙ্খলা এবং গুরু-শিষ্যের নিবিড় সম্পর্কের ফলেই এই অভাবনীয় সাফল্য বলে মনে করছে শিক্ষা মহল।

রাজ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে নজর কেড়েছে জিষ্ণু কুন্ডু। তার প্রাপ্ত নম্বর ৪৯৫। নিজের সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে বন্ধুদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে জিষ্ণু জানায়, "সবারই ব্যক্তিগত জীবন থাকে। পড়াশোনার মাঝে যখনই কোনো সমস্যা হতো, বন্ধুরা আমায় উৎসাহ দিত। আমরা একে অপরকে সাহস জুগিয়েছি। আমাদের এই সাফল্যে বন্ধুদের অনেক বড় অবদান রয়েছে।"

ছেলের সাফল্যে গর্বিত জিষ্ণুর মা বলেন, "আমরা কখনও বাড়তি চাপ দিইনি। ও নিজের আগ্রহেই দায়িত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছে।"

অন্যদিকে, ৪৯৪ নম্বর পেয়ে রাজ্যে তৃতীয় হয়েছে প্রীতম বল্লভ। অর্থনীতির ছাত্র প্রীতমের লক্ষ্য ভবিষ্যতে অধ্যাপক বা গবেষক হওয়া। সে বলে,"একাদশের বার্ষিক পরীক্ষায় রাজ্যে প্রথম হয়েছিলাম, তাই উচ্চমাধ্যমিকেও একটা প্রত্যাশা ছিল। সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ায় আমি খুশি।"

তৃতীয় স্থানেই রয়েছে দেবপ্রিয় মাজি। তার কথায়, "এই সাফল্যে খুব খুশি"।
ছেলের এই সাফল্যে আপ্লুত দেবপ্রিয়ের মা জানান, পঞ্চম শ্রেণি থেকেই দেবপ্রিয় মিশনে পড়াশোনা করছে। এই কৃতিত্বের জন্য তিনি ঈশ্বর এবং মহারাজদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

পঞ্চম স্থানে ৪৯২ নম্বর পেয়েছে ত্রিদেব চক্রবর্তী ও সৌমিক দত্ত। ইঞ্জিনিয়ারিং লক্ষ্য ত্রিদেবের। সে প্রতিদিন গড়ে ১০-১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করত। 
অন্যদিকে, চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে সৌমিক জানায়, আগের সেমিস্টারে ষষ্ঠ হয়েছিল, এবার পঞ্চম হয়ে সে অত্যন্ত আনন্দিত।

ষষ্ঠ স্থানে ৪৯১ নম্বর পেয়ে এই স্থানে রয়েছে চার জন , শুভদীপ অধিকারী, মণিদীপ মাহাতো, সৌমাল্য রুদ্র ও সৌম্যদীপ খাঁ।

মণিদীপ মাহাতো জানায়, "আমি গেম ডেভেলপার হতে চাই"। মণিদীপের বাবা নিজের খাবারের দোকানের সামান্য আয় থেকে অনেক কষ্টে ছেলের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। ছেলের সাফল্যে তিনি আজ বাকরুদ্ধ। 
পুরুলিয়া ১ নম্বর ব্লকের বিডিও মনোজ কুমার মাইতি মণিদীপকে মিষ্টি ও শরৎচন্দ্রের বই দিয়ে সংবর্ধনা জানান।

সৌমাল্য রুদ্র আবার একটু অন্যরকম। সে জানায়, "স্ট্যাটিস্টিকস নিয়ে পড়ার ইচ্ছে রয়েছে আমার।" সে জানিয়েছে সে বিভূতিভূষণ বা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে মজে থাকে। তারাশঙ্করের ‘কবি’ ও ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ তার অত্যন্ত প্রিয়।

৪৮৯ নম্বর পেয়ে রাজ্যে অষ্টম হয়েছে আদর্শ মন্ডল। সে জানিয়েছে, 
চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে ইচ্ছুক। পরের বছরের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য আদর্শ তার সাফল্যের তিনটি মন্ত্রের কথা জানিয়েছে, প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন শেষ করা, নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। স্মার্টফোন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা। তার কথায়, "গ্রুপ স্টাডি আমার সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ। মিশনের শিক্ষক ও মহারাজদের অবদান ভোলা সম্ভব নয়।"

পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক,স্বামী জ্ঞানরূপানন্দ মহারাজ জানান, "পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের মোট ৬৪ জন ছাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছিলো।
তাদের মধ্যে ১৭ জন ছাত্র পশ্চিমবঙ্গের মেধাতালিকায়  স্থান পেয়েছে।"

মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া ছাত্রদের নাম র‍্যাঙ্ক অনুযায়ী

▪️দ্বিতীয় 
জিষ্ণু কুন্ডু ৪৯৫
▪️তৃতীয় 
দেবপ্রিয় মাজি ৪৯৪
তন্ময় মন্ডল ৪৯৪
প্রীতম বল্লভ ৪৯৪
▪️পঞ্চম
ত্রিদেব চক্রবর্তী ৪৯২
সৃজন পরিছা ৪৯২
সৌমিক দত্ত ৪৯২
▪️ষষ্ঠ
শুভদীপ অধিকারী ৪৯১
মণিদীপ মাহাতো ৪৯১
সৌম্যদীপ খাঁ ৪৯১
সৌমাল্য রুদ্র ৪৯১
▪️সপ্তম
সৌম্যদীপ ঘোষ ৪৯০
▪️অষ্টম 
আদর্শ মন্ডল ৪৮৯
▪️নবম
অরিত্র দুয়ারি ৪৮৮
ময়ূখ পাল ৪৮৮
আদিত্য নারায়ণ জানা ৪৮৮
▪️দশম
অম্লান রায় ৪৮৭

এই সাফল্যের পেছনে রামকৃষ্ণ মিশনের পবিত্র পরিবেশ, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন, শিক্ষক ও ব্রহ্মচারীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা এবং শ্রীরামকৃষ্ণ দেব, মা সারদা ও স্বামী বিবেকানন্দের কৃপাকে কৃতিত্ব দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক ।
তিনি আরও জানান যে, "এই ছাত্ররা শুধুমাত্র পুরুলিয়ার নয়, বরং মেদিনীপুর, বর্ধমান, বাঁকুড়াসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছে।"

পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠ প্রমাণ করে দিল যে, সঠিক পরিচালনা এবং নিষ্ঠা থাকলে মফস্বল বা জেলা থেকেও রাজ্যের শিক্ষা মানচিত্রে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা সম্ভব। মেধা তালিকার ১৭ জনের মধ্যে ৩ জনের বাড়ি পুরুলিয়ায় হলেও, বাকিরা বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এই লাল মাটির বিদ্যাপীঠেই নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে নিয়েছে। মিশনের মহারাজ ও শিক্ষকদের আশীর্বাদ আর ছাত্রদের অদম্য জেদ আজ জেলাকে গর্বিত করেছে।