সাধারণ খবর ব্লক শহর

"একজনের হিংসা বাংলার মানুষকে রেখেছিল বঞ্চিত", আদিবাসী অভিযানের শুরুয়াতে কটাক্ষ সুদীপের

এ যেন আদিবাসীদের জন্য ডবল ইঞ্জিন সরকারের সুফল। সবচেয়ে দূরের যে গ্রাম, পিছিয়ে থাকা যে গ্রাম সেগুলিকেই রাখা হয়েছে পুরুলিয়ার ১২৮ টি শিবিরের তালিকায়। বিলুপ্ত প্রায় আদিবাসী ও জনজাতিগোষ্ঠীগুলির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই এই কর্মসূচি নিয়েছে কেন্দ্রের আদিবাসী মন্ত্রক ও রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগ।

 

নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া ও ঝালদা:

জাতীয় জনজাতি কমিশন এসেছিল পুরুলিয়া। ফেব্রুয়ারি মাসের ২৬ তারিখ পুরুলিয়া এসে তৎকালীন রাজ্য সরকারকে এক হাত নিয়েছিল কমিশন। অভিযোগ তুলেছিল এ জেলায় সুরক্ষিত নেই জনজাতিদের অধিকার। আর এবার রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হতেই আদিবাসীদের জন্য এক বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করল সরকার। রাজ্য জুড়ে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ কর্মসূচিতে পুরুলিয়াও। আয়োজিত হচ্ছে বিশেষ ক্যাম্প। সঙ্গে চলবে জনশুনানিও। জন শুনানি শিবিরে আদিবাসীদের বিভিন্ন অভিযোগ শুনবেন সরকারি আধিকারিকরা।

এ যেন আদিবাসীদের জন্য ডবল ইঞ্জিন সরকারের সুফল। সবচেয়ে দূরের যে গ্রাম, পিছিয়ে থাকা যে গ্রাম সেগুলিকেই রাখা হয়েছে পুরুলিয়ার ১২৮ টি শিবিরের তালিকায়। বিলুপ্ত প্রায় আদিবাসী ও জনজাতিগোষ্ঠীগুলির  সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই এই কর্মসূচি নিয়েছে কেন্দ্রের আদিবাসী মন্ত্রক ও রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগ। 
এক কর্মসূচিতে দুটি প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী জনজাতি আদিবাসী ন্যায় মহা অভিযান। দ্বিতীয়টি ধরতি আবা জনজাতীয় গ্রাম উৎকর্ষ অভিযান। সোমবার পুরুলিয়া জেলা প্রশাসনিক ভবনে ট্যাবলোর সূচনার মধ্যে দিয়ে এই কর্মসূচি শুরু হয়।
ছিলেন বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায়, জেলা শাসক সুধীর কোন্থম।

জেলা শাসক সুধীর কোন্থম  বলেন, "জনভাগীদারি ক্যাম্পেইনের মূল উদ্দেশ্য হলো দুটি প্রধান সরকারি প্রকল্প সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং এর প্রচার চালানো। প্রকল্পটি বিশেষভাবে অনগ্রসর বা প্রান্তিক আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর যেমন বীরহোড় জন্য তৈরি। এর মাধ্যমে প্রতিটি আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার প্রান্তিক বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা, পানীয় জল, বিদ্যুৎ এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
আদিবাসী জনসংখ্যা অধ্যুষিত বা আদিবাসী প্রধান এলাকাগুলোতে পরিকাঠামোগত বিভিন্ন প্রকল্প একযোগে বা কনভারজেন্স মডেলে বাস্তবায়ন করাই এই অভিযানের লক্ষ্য।
সোমবার  থেকে এক সপ্তাহ ধরে মোট ১২৮টি ক্যাম্প বা শিবির অনুষ্ঠিত হবে। এই অঞ্চলের সবকটি ব্লকের আদিবাসী প্রধান এলাকাতেই এই ক্যাম্পগুলো করা হবে। এই ক্যাম্পগুলো থেকে সরাসরি আদিবাসীদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও পরিষেবা দেওয়া হবে। যেমন,কাস্ট সার্টিফিকেট  জাতিগত শংসাপত্র প্রদান,
বিদ্যুৎ সংযোগ ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করা,স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া।ক্যাম্পগুলোতে 'জন শুনানি'-র ব্যবস্থা থাকবে। আদিবাসী গ্রামের সাধারণ মানুষের কোনো অভিযোগ বা সমস্যা থাকলে, তা সেখানে নথিভুক্ত করা হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে সরকারি পরিষেবা বা পাবলিক সার্ভিস ডেলিভারির মাধ্যমে তা সমাধান করা হবে।
এই ক্যাম্পগুলোতে সরকারের সবকটি প্রয়োজনীয় লাইন ডিপার্টমেন্ট উপস্থিত থাকবে। যেমন বিদ্যুৎ বিভাগ , স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি বিভাগ, বন বিভাগ  এবং ব্লক স্তরের বিডিও ও অন্যান্য আধিকারিকগণ। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সুবিধার্থেই এই ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।" 
পুরুলিয়ার বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায় বলেন, "আগে সারা ভারতের মানুষ যে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা পেত, একজনের হিংসার কারণে বাংলা তার থেকে বঞ্চিত ছিল। এখন জেলা শাসক এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলায় এই সুযোগ-সুবিধার কাজ শুরু হয়েছে।
আমাদের এই উদ্যোগের কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই, বরং সাধারণ মানুষের কল্যাণই এর মূল লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের প্রতি মানুষের যে আস্থা ও ভরসা রয়েছে, কাজের মাধ্যমে আমরা সেই প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রক্ষা করতে চাই।"
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে প্রতিটি পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদ এবং পৌরসভায় ভারতীয় জনতা পার্টির প্রতি মানুষের সমর্থন থাকবে। এর ফলে ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’-এর পর একটি ‘ট্রিপল ইঞ্জিন সরকার’ গঠিত হবে, যা উন্নয়নের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
পশ্চিমবঙ্গের পিছিয়ে পড়া এবং বিলুপ্তপ্রায় জনজাতিদের যেমন বীরহড়, শবর কল্যাণে বিভিন্ন কাজ করা হবে। প্রতিটি ঘরে বিজলি পৌঁছানো,প্রত্যন্ত এলাকায় পাকা রাস্তা নির্মাণ, সবার জন্য পাকা বাড়ি তৈরি, প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন অনুযায়ী স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং শৌচাগার নির্মাণ।
পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই সরকার কাজ করছে। তিনি আশ্বাস দেন যে সমস্ত জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে স্বচ্ছতার সাথে একটি 'নতুন বাংলা' গড়ে তোলার লক্ষ্যে তারা এগিয়ে চলবেন।

অন্যদিকে  ঝালদা ১ নম্বর ব্লকের একেবারে পিছিয়ে পড়া গ্রাম হেঁসাহাতুতে একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জনজাতীয় গরিমা উৎসবের প্রচার অভিযান শুরু হয়। হেঁসাহাতুতে ফতে সিং হাইস্কুলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ছিলেন বাঘমুন্ডির বিধায়ক রহিদাস মাহাতো।
ঝালদা ১ ব্লকের মহুলটা‌ড়‌ গ্ৰামের  বাসিন্দা মালতি শিকারী বলেন, "আমাদের কোনো জায়গা-জমি নেই, শুধু থাকার জন্য এই ঘরটুকুই আছে। বর্ষাকালে ঘরের ছাদ দিয়ে জল পড়ে।।আমার কোনো গরু বা বাছুর নেই।"
তিনি নতুন সরকারের কাছে একটি থাকার জন্য ভালো ঘর এবং একটি গরু বা বাছুর আশা করছেন।
তিনি দড়ি তৈরি করে তা বিক্রি করে সংসার চালান। তিনি এই দড়িগুলো ঝাড়খণ্ডের গোলা-র হাটে নিয়ে বিক্রি করেন। প্রতিটি দড়ি তিনি ৪০ টাকা করে বিক্রি হয়।

ঝালদা ১ ব্লকের মহুলটাড় গ্ৰামের বাসিন্দা বুদ্ধেশ্বর শিকারি বলেন, "আমাদের এখানে কোনো খেত-খামার নেই, ওগুলো দিলে ভালো হতো। কতবার লেখালেখি করা হয়েছে তাও পাওয়া যায়নি। আমাদের কোনো জায়গাই নেই। গোরুর গোয়াল না দিলে কাজ কেমনে হবে? শুধু বাড়িই পাওয়া গেছে।বর্ষার সময় জল ঢোকে এদিক-ওদিক দিয়ে।জলের কোনো সমস্যা নেই, জল পাওয়া যায়"।
জেলার মধ্যে ঝালদা ১, বাঘমুন্ডি ও বলরামপুরে বাস বিলুপ্ত প্রায় জনজাতি বিরহোড়দের। অন্যদিকে আদিবাসী জনজাতি রয়েছে জেলার ২০ টি ব্লকেই। শিবির এর আগেও হয়েছে। দুয়ারে এসেছে সরকার। আবাস থেকে শৌচাগার মিলেছে সবই। কিন্তু তাতে তো পরিস্থিতি পাল্টায়নি। কাজের নিশ্চয়তা চাইছে বিলুপ্ত প্রায় জনজাতি বিরহোড়রা। চাইছে চাষ করার জন্য জমি। তা কি দেখা যাবে বাস্তবে? আশায় বুক বাঁধছে তারা।