নিজস্ব প্রতিনিধি,আড়শা:
ঝাঁ চকচকে ক্লাসরুম নেই, নেই নামী-দামি শহরের নাম করা কোনো কোচিং সেন্টারের গাইডেন্স। এমনকি বিগত দেড় দশক ধরে চলা শিক্ষক সংকটের জেরে নিজের স্কুলেও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের স্থায়ী শিক্ষক পায়নি সে। তা সত্ত্বেও স্রেফ অদম্য ইচ্ছা আর গ্রামের বেকার যুবকদের তৈরি অবৈতনিক কোচিংয়ের ওপর ভরসা করেই অসাধ্য সাধন করল পুরুলিয়ার আড়শা ব্লকের গৌরাদাগ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সুরেশ রায়। ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৪৫০ নম্বর পেয়ে আড়শা ব্লকের মধ্যে প্রথম স্থান ছিনিয়ে নিয়েছে সে।
একইভাবে মাধ্যমিকেও ব্লকের মুখ উজ্জ্বল করেছে সিরকাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের অন্বেষা পাল। তার প্রাপ্ত নম্বর ৬৭৩। প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙানো এই দুই কৃতিকে ঘরে গিয়ে সংবর্ধনা জানাল নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি।
চরম আর্থিক অনটনের সংসার সুরেশদের। ১০ বাই ৭ ফুটের একটা ছোট্ট টিনের চালার ঘর, আর তাও আক্ষরিক অর্থেই 'ভিড়ে ঠাসা'। বাবা-মা, চার কাকা-জ্যাঠা ও তাঁদের পরিবার নিয়ে একান্নবর্তী এই সংসারে গরমের দিনে ঘরের ভেতর টেকা দায়। গ্রীষ্মে পারদ যখন ৪৮ ডিগ্রিতে পৌঁছায়, তখনও রান্না চলে খোলা আকাশের নিচেই। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে সুরেশের পরিবারের বাকি সদস্যদের রাত কাটাতে হয় কালো ত্রিপলের নিচে।
শহরের নামী স্কুলে পড়ার সাধ থাকলেও সাধ্য ছিল না সুরেশের। কিন্তু দারিদ্র্যকে যে মেধার কাছে হার মানতেই হয়, তা প্রমাণ করে দেখাল সুরেশ। বিভিন্ন বিষয়ে তার প্রাপ্ত নম্বরগুলি নজরকাড়া।
দর্শন ৯২, ভূগোল ৯২,এডুকেশন ৯১,ইতিহাস ৮৮, বাংলা ৮৭, ইংরেজি ৮৬ ।ভবিষ্যতে ইতিহাস নিয়ে উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার স্বপ্ন দেখে সুরেশ।
২০১১ সালের পর থেকে রাজ্যে স্কুল স্তরে নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ কার্যত থমকে। আড়শা ব্লকের বেশিরভাগ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই নির্দিষ্ট বিষয়ের স্থায়ী শিক্ষক নেই। বাধ্য হয়ে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক বা স্কুল পরিচালন সমিতির অস্থায়ী শিক্ষকদের ওপর ভরসা করতে হয় পড়ুয়াদের। সুরেশের এই সাফল্যের পেছনে তাই নিজের স্কুলের শিক্ষকদের পাশাপাশি বড় অবদান রয়েছে গ্রামেরই কিছু বেকার শিক্ষিত যুবকদের, যাঁরা কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছাড়া গ্রামে কোচিং সেন্টার চালিয়ে এই প্রান্তিক এলাকার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা সচল রেখেছেন।
শনিবার আড়শা ব্লকের এই দুই কৃতি পড়ুয়ার বাড়িতে পৌঁছে যান এবিটিএ নেতৃত্ব। সুরেশের বাড়িতে গিয়ে তাকে শংসাপত্র, ফুলের স্তবক, বই, পেন এবং মিষ্টিমুখ করিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবিটিএ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক তথা পুরুলিয়া জেলা সম্পাদক ব্যোমকেশ দাস, জেলা কোষাধ্যক্ষ ফাল্গুনী কুন্ডু, তুষারক্রান্তি ঘোষ, তপন কুমার মন্ডল এবং স্থানীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাথুরাম মন্ডল।
নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয় , "সুরেশের মতো প্রতিভারা যাতে শুধু টাকার অভাবে থমকে না যায়, তা নিশ্চিত করবে সংগঠন। ভবিষ্যতে ওর পড়াশোনার যেকোনো দরকারে নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি অভিভাবকের মতো পাশে থাকবে।"
এরপর প্রতিনিধি দলটি পৌঁছায় মাধ্যমিকে ব্লক সেরা অন্বেষা পালের বাড়িতেও। অন্বেষার এই অভাবনীয় সাফল্যে তাকেও সমিতির পক্ষ থেকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত ও সংবর্ধিত করা হয়।
পরিকাঠামোর অভাব আর চরম দারিদ্র্যের অন্ধকারের সাথে লড়াই করে সুরেশ ও অন্বেষার এই জয়যাত্রা আজ সমগ্র পুরুলিয়া জেলার ছাত্রছাত্রীদের কাছে এক নতুন অনুপ্রেরণা।