সুজয় দত্ত ও সুইটি চন্দ্র :
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়মন্ড হারবারের ‘মডেল’ ভেঙে ফিরলেন পুরুলিয়ার জ্যোতির্ময়। আর ফিরেই শুক্রবার ঝালদা থেকে পুরুলিয়া শহর— একের পর এক দলীয় কর্মসূচিতে ব্যস্ত দেখা গেল বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোকে।
পুষ্পা নাকি ঝুঁকতেন না। কিন্তু ফলতার পুনর্নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানকে শেষ পর্যন্ত ঝুঁকতেই হল। যে জাহাঙ্গীর ভোট প্রচারের মাঝপথে নিজেকে ‘পুষ্পা’ বলে ঘোষণা করেছিলেন, তিনিই ভোটের আগে কার্যত রণে ভঙ্গ দিলেন। আর সেই রাজনৈতিক নাটকের নেপথ্যে উঠে এল এক নতুন নাম— পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো।
ডায়মন্ড হারবার মানেই এতদিন ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক বলয়। সেই বলয়ের ভিতরেই বিজেপি পাঠিয়েছিল পুরুলিয়ার এই তরুণ সাংসদকে। দায়িত্ব ছিল ফলতা বিধানসভার পুনর্নির্বাচন সামলানোর। পুরুলিয়ার ন’টি বিধানসভাতেই পদ্ম ফোটানোর পর এ যেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলির একটি।
জেলার প্রান্তিক কুড়মি পরিবারের ছেলে জ্যোতির্ময় বনাম রাজ্যের শাসকদলের ‘যুবরাজ’। রাজনীতির নাটকীয়তায় এই সংঘাত যেন তৈরি করেছিল আলাদা কৌতূহল। পুরুলিয়ায় এসে বারবার জ্যোতির্ময়কে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে গিয়েছেন অভিষেক। উন্নয়ন নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্কের ডাকও দিয়েছেন। আর সেই অভিষেকের ‘খাসতালুক’-এই গিয়ে বিজেপির হয়ে সংগঠন দাঁড় করানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন জ্যোতির্ময়।
৫ মে বাঘমুন্ডিতে বিজয় উৎসবে অংশ নেওয়ার পর থেকেই কার্যত টানা রাজনৈতিক ব্যস্ততা শুরু হয় তাঁর। ৬ মে নবান্নে প্রশাসনিক বৈঠক, ৮ মে অমিত শাহর বৈঠকে উপস্থিতি, সেখানেই বিজেপির বিধানসভা দলনেতা হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীকে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত। ৯ মে ব্রিগেডে মুখ্যমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানেও দেখা যায় তাঁকে।
তারপরই ফলতা অধ্যায়। ১১ ও ১২ মে কলকাতার বৈঠকে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয় পুনর্নির্বাচনের। ১৩ মে থেকে কার্যত ডেরা পড়ে যায় ফলতায়। কখনও মণ্ডল সভাপতিদের সঙ্গে বৈঠক, কখনও জনসংযোগ, কখনও র্যালি। ১৪ মে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডার সমর্থনে পদযাত্রা করেন। ১৬ মে উদ্বোধন করেন পার্টি অফিস। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সভা থেকে শুভেন্দু অধিকারীর জনসভা— সর্বত্রই উঠে আসে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি।
১৯ মে ফলতার বানেশ্বরপুর শিবমন্দিরে পুজো দিতে দেখা যায় জ্যোতির্ময়কে। আর সেই দিনই কার্যত ভোটের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর বার্তা দেন জাহাঙ্গীর খান। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সেটাই ছিল নির্বাচনের আসল টার্নিং পয়েন্ট।
২১ মে দুর্গাপুরে প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত থাকার পর শুক্রবার ফের নিজের জেলায় ফিরেছেন সাংসদ। ঝালদায় বিজয় মিছিলে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি পুরুলিয়া শহরের দলীয় কার্যালয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বৈঠকেও দেখা যায় তাঁকে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—
“ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়,
তোমারি হউক জয়।”
কংগ্রেস যুগ, বাম আমল কিংবা তৃণমূল পর্ব— দীর্ঘদিন ধরেই পুরুলিয়ার নেতারা থেকেছেন রাজ্য রাজনীতির প্রান্তসীমায়। বড় নেতাদের ছায়ার আড়ালেই কেটেছে তাঁদের রাজনৈতিক জীবন। সেই ট্র্যাডিশন ভাঙছেন কি জ্যোতির্ময়? বিজেপির অন্দরেই এখন সেই আলোচনা জোরালো।
রাজ্য রাজনীতির পাশাপাশি দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দেও ধীরে ধীরে বাড়ছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা— এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। প্রশ্ন উঠছে, পুরুলিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক উপেক্ষার ইতিহাসে কি তবে নতুন অধ্যায় লিখতে চলেছেন জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো? জেলার একাংশ অন্তত সেই উত্তর খুঁজতে শুরু করেছে।