শিক্ষা ব্লক

একটুকরো ভারতকে বুকে নিয়ে পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন রেকর্ড গড়লো মাধ্যমিকে

পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক স্বামী জ্ঞানরূপানন্দ মহারাজ বলেন, "আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরাবর ভালো ফল করে। তবে এবার অতীতের সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ, সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের এই প্রতিষ্ঠান।"
একটুকরো ভারতকে বুকে নিয়ে পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন রেকর্ড গড়লো মাধ্যমিকে

 

সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া :

গতবছরের খরা কাটিয়ে পুরুলিয়ার মাটিতে যেন আবার ফিরে এল সেই পুরনো গৌরব। এক, দু’জন নয়, এ বার মাধ্যমিকের মেধাতালিকায় রাজ্যের সেরাদের মধ্যে জায়গা করে নিল পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের সাত ছাত্র। অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে প্রান্তিক জেলার এই আবাসিক বিদ্যালয় যেন ফের বুঝিয়ে দিল, মেধার ঠিকানা কেবল শহর নয়, পরিবেশ। আর সেই পরিবেশ গড়ে ওঠে শৃঙ্খলা, সাধনা ও আত্মনিবেদনের ভিতের উপর।
২০২৩ সালে এই বিদ্যাপীঠের ছ’জন ছাত্র রাজ্যের মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছিল। অবশ্য হতাশাই সঙ্গী ছিল গত বছর । শুধু এই প্রতিষ্ঠান নয়, গোটা পুরুলিয়া জেলা থেকেই কেউ জায়গা করতে পারেননি মেধাতালিকায়। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে ছবিটা যেন আমূল বদলে গেল। এ বার রাজ্যের সপ্তম স্থানে রয়েছে বিদ্যাপীঠের অভিনব প্রতিহার। প্রাপ্ত নম্বর ৬৯১। নবম স্থানে যুগ্মভাবে জায়গা করেছে বোধিসত্ত্ব ঘোষ ও সৌম্য সরকার। দু’জনেরই প্রাপ্ত নম্বর ৬৮৯। দশম স্থানেও রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের চার ছাত্র। দেব পাল, অর্কপ্রভ চক্রবর্তী, আদিত্য রাজ ও শিবম আনন্দ।তবে আরও তাৎপর্যের বিষয়, এই সাত কৃতীর কেউই পুরুলিয়ার বাসিন্দা নয়। হুগলি, পূর্ব বর্ধমান, উত্তর ২৪ পরগণা, হাওড়া থেকে শুরু করে বিহারের নালন্দা ও সারন। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে তারা এক ছাদের তলায় গড়ে তুলেছে সাফল্যের নতুন ইতিহাস। যেন ছোট্ট এক ভারতবর্ষ দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরুলিয়ার বুকে।

পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক স্বামী জ্ঞানরূপানন্দ মহারাজ বলেন, "এবার মোট ৯৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে সকলেই প্রথম বিভাগে পাশ করেছে। ডাবল 'এ' গ্রেড পেয়েছে ৯৫ জন। 'এ প্লাস' গ্রেড পেয়েছে ১ জন। জীবন বিজ্ঞানে ১০০ পেয়েছে মোট ৩৭ জন। গড় ৯৮.৪১ শতাংশ। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরাবর ভালো ফল করে। তবে এবার অতীতের সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ, সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের এই প্রতিষ্ঠান।"

বিদ্যাপীঠের আবহেই রয়েছে তার বিশেষত্ব। ক্যাম্পাসে প্রবেশের মুখে চোখে পড়ে প্রধান ফটকে লেখা স্বামী বিবেকানন্দের সেই অমর বাণী, “ওঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না।” এই বাণী যেন প্রতিদিনের জীবনচর্চা এখানে। নিয়ম, নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সবটাই ছাত্রদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলো, শরীরচর্চা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে তাদের সামগ্রিক বিকাশ।

রাজ্যের মেধা তালিকায় দশম স্থান দখল করা বিদ্যাপীঠের ছাত্র অর্কপ্রভ চক্রবর্তীর কথাতেই ফুটে উঠছে সেই আধ্যাত্মিক ভাবনার কথা। " সন্ধ্যার ভজন আমাদের বিদ্যাপীঠের পরিবেশকে আরও আধ্যাত্মিক করে তোলে। সেই আধ্যাত্মিকতার শক্তিতে আমরা আরও মনোযোগী হয়ে পড়তে পারি। বিদ্যাপীঠের পরিবেশটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। আমাদের সাফল্যের প্রধান উপকরণই হলো এই পরিবেশ।"

পুরুলিয়া শহরের উপকণ্ঠে পুরুলিয়া ২ নং ব্লকের বোঙ্গাবাড়িতে ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই বিদ্যাপীঠ। স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শে পরিচালিত এই সর্বভারতীয় আবাসিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৮০০ ছাত্র পড়াশোনা করে। বাংলা ও ইংরেজি— দুই মাধ্যমেই পাঠদান হয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে এখানে একটাই পরিচয়, তারা বিদ্যাপীঠের ছাত্র।


তবে এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়াও সহজ নয়। মূলত পঞ্চম ও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি নেওয়া হয়। পঞ্চম শ্রেণিতে প্রবেশের জন্য চতুর্থ শ্রেণিতে অন্তত ৬০ শতাংশ নম্বর পেয়ে বসতে হয় ভর্তি পরীক্ষায়। আবার একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ৯০ শতাংশ এবং কলা বিভাগে ৮০ শতাংশ নম্বর না থাকলে সুযোগই মেলে না প্রবেশিকা পরীক্ষার। সেই কঠিন ছাঁকনি পেরিয়েই তৈরি হয় মেধার ভিত। ফল প্রকাশের দিন তাই বিদ্যাপীঠ চত্বরে ছিল না কোনও বাড়তি উচ্ছ্বাস। ছিল এক গভীর প্রশান্তি। কারণ, এই সাফল্য তাদের কাছে কেবল নম্বরের জয় নয়, আদর্শেরও জয়।