সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:
পুরুলিয়ার হুড়ায় চলছে মহাপ্রভু জগন্নাথের সেবার ব্যতিক্রমী আয়োজন। রথযাত্রার দিন থেকে শুরু হয়ে আজ উল্টোরথ পর্যন্ত—টানা আট দিন ধরে ভগবানের মাসির বাড়িতে সেবা চলছে। প্রতিদিন পাত পড়ছে হাজারো ভক্তের জন্য। আর তাদের সেবা করছেন নদিয়া থেকে আনা ৪২ জন পাচক ও তাদের সহকারী মিলিয়ে শতাধিক রন্ধন শিল্পী।
এই বিশাল আয়োজনের কেন্দ্রে রয়েছে মহাপ্রভুর ৫৬ ভোগ। শুধু দুপুরেই নয়, ভোর সাড়ে চারটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মোট পাঁচ বেলা ভোগ নিবেদন করা হচ্ছে। মঙ্গলারতি থেকে শুরু করে রাতের শেষ ভোগ পর্যন্ত প্রতিটি বেলাতেই থাকছে নানা পদ, যা তৈরি হচ্ছে পুরাণ অনুযায়ী নির্দিষ্ট নিয়মে। এই রথযাত্রার আয়োজক হুড়া রথ মহোৎসব কমিটি জানিয়েছে, এবারের আয়োজন ১১ বছরে পদার্পণ করল। অতীতে বাঁকুড়ার ঝাঁটিপাহাড়ি জগন্নাথ মন্দির থেকে বিগ্রহ এনে হুড়ায় রথে অধিষ্ঠান করানো হতো। এবার বিগ্রহ এসেছে হুড়ার সুভদ্রা কলোনিতে। যেখানে নতুন জগন্নাথ মন্দির নির্মাণাধীন। সেখান থেকেই রথে চড়ে ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা পাড়ি দেন মাসির বাড়ি—পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু সরণিতে, প্রায় তিন কিমি দূরে। এই রথযাত্রার মূল পুরোহিত কমলনয়ন দাস জানান, “পুরীর আদলেই এখানে রথ তৈরি হয়েছে মায়াপুর ইসকনের তত্ত্বাবধানে। প্রতিবছর পুরী থেকে রথের লাল পতাকা আনা হয়, যা পরে অর্পণ করা হয় জগন্নাথ দেবের চরণে। আমরা সেই প্রাচীন ঐতিহ্য মেনেই এখানে ভোগ নিবেদন করি।”
৫৬ ভোগের রাজভোগে
কি কি থাকে? গোবিন্দভোগ চালের ভাত, ঘি-ভাত, বাসন্তী পোলাও, তেতো ডাল, বিভিন্ন ভাজাভুজি (বেগুন, কাকরোল, আলু-পটল), বড়া (মোচা, সজনে পাতা, বাঁধাকপি, বিউলি ও মাসকলাই ডাল দিয়ে), পাঁচমিশালি তরকারি, বেবিকর্ন সবজি, তেল পটল, সরষে বেগুন, ঝিঙে-পোস্ত, মোচার ঘন্ট, পাঁপড়ের তরকারি, ধোকার ডালনা, পনির-পোস্ত, পনির-মশলা এবং আরও অনেক পদ।
পাশাপাশি থাকছে বিভিন্ন স্বাদের চাটনি—টমেটো, আনারস, আমড়া, আপেল দিয়ে তৈরি। মিষ্টির তালিকায় রয়েছে পাটিসাপটা, নারকেল ও তিলের নাড়ু, রসবড়া, মালপোয়া, সিমুইয়ের পায়েস।
ভোর সাড়ে চারটেয় মঙ্গলারতিতে পেড়া, খেজুর, মিষ্টান্ন দিয়ে বাল্যভোগ। সকাল ৭টায় জলখাবারে লুচি, সবজি, ক্ষীর, দুধ-ছানা ও ফল। দুপুরে রাজভোগের পর বিকেল সাড়ে চারটায় বৈকালিক আরতি, সন্ধ্যায় সন্ধ্যা ভোগ এবং রাত আটটায় রাত্রিকালীন ভোগ—সবসময়েই বৈচিত্র্যময় পরিবেশনে মহাপ্রভুর সেবা চলছে।
হুড়ার কেশরগড় ছিল পঞ্চকোট রাজপরিবারের পুরনো রাজধানী। রাজ্যপাট কাশিপুরে সরে যাওয়ার পর রথযাত্রার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। এখন সেই ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করেছে হুড়া রথ মহোৎসব কমিটি। সহ-সভাধিপতি সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “এই রাজভোগের মহাপ্রসাদ যেন অমৃতের স্বাদ দেয়। আটটা দিন ধরে এখানে শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এক বিশাল মিলনমেলা বসে যায়।”
প্রতিদিন ভোরে রান্নাঘরের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় সেবা। রাত পর্যন্ত চলে মহাপ্রভুর আহার, আর তারই সঙ্গে অগণিত ভক্তের ভালোবাসা আর ভক্তি নিবেদিত হয় পাত পেতে।











Post Comment