নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:
যে রাষ্ট্রগান বন্দেমাতরম-এর ১৫০ বছর পালিত হচ্ছে দেশজুড়ে সাড়ম্বরে, সেই গান যে বইয়ের সেই আনন্দমঠ যে ভাষায় লেখা, শুধুমাত্র সেই বাংলায় কথা বলার কারণেই ভিনরাজ্য ছত্তিশগড়ে চরম হেনস্থার শিকার হলেন পুরুলিয়ার আট জন সংখ্যালঘু পরিযায়ী শ্রমিক। অভিযোগ, বাংলাদেশি সন্দেহে স্থানীয় বজরং দলের কর্মীরা তাদের নির্মমভাবে মারধর করে। ভেঙে গিয়েছে এক শ্রমিকের হাত। ঘটনাকে ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে জেলাজুড়ে।
পুরুলিয়া মফস্বল থানার চেপড়ি গ্রামের বাসিন্দা শেখ জসিম, শেখ আসলাম, শেখ ববি, শেখ জুলফিকার ও শেখ সাহিল, এই থানারই তেঁতলো গ্রামের আরবাজ কাজী এবং আড়শা থানার ভুরসু গ্রামের শেখ মিনাল ও শেখ ইসলমাইল—এই আট জন যুবক কয়েক মাস আগে কাজের সন্ধানে ছত্তিশগড়ের একটি পাউরুটি কারখানায় যোগ দেন। অভিযোগ, গত রবিবার পারিশ্রমিক সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বচসার পরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই সময় কারখানায় আসা স্থানীয় বজরং দলের কয়েকজন সদস্য শ্রমিকদের বাংলায় কথা বলতে শুনে তাঁদের বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেয়। এরপরই শুরু হয় বেধড়ক মারধর ও হুমকি। মারধরে গুরুতর জখম হন শেখ জসিম। ভেঙে যায় তাঁর একটি হাত। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের উদ্ধার করে।
চরম আতঙ্কে ভুগছেন আক্রান্ত শ্রমিকরা। তাঁদের দাবি, এমন ঘটনার পর আর বাইরে গিয়ে কাজ করার সাহস পাচ্ছেন না।
পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার বৈভব তেওয়ারি বলেন,”ঘটনার খবর পেয়ে রাইপুর জেলার কোতয়ালি থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে পুরুলিয়া জেলা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্ত নথি যাচাই করা হয়। চার জন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে ছেড়ে দেওয়া হলেও, চার জন নাবালক হওয়ায় আপাতত তাদের স্থানীয় হোমে রাখা হয়েছে।” মঙ্গলবার চার শ্রমিক নিরাপদে নিজেদের গ্রামে ফিরে আসেন। বাকিরাও শিগগির ফিরবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।
মঙ্গলবার চেপড়ি গ্রামে আক্রান্ত শ্রমিকদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন তৃণমূল কংগ্রেসের পুরুলিয়া ২ নম্বর ব্লকের তৃণমূল নেতা আজিম আনসারি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহ-সভাপতি পায়েল রাজা, জেলা যুব তৃণমূলের সহ-সভাপতি বিকাশ মাহাত, ব্লক যুব সভাপতি মৃণাল বাউরি এবং শ্রমিক সংগঠনের ব্লক সভাপতি মনোরঞ্জন দেওঘরিয়া।
পরিবারগুলির সঙ্গে কথা বলে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তৃণমূল নেতৃত্ব। আক্রান্ত সদ্যদের বাড়িতে যাবেন তৃণমূল জেলা সভাপতি রাজীব লোচন সরেন। এ প্রসঙ্গে বিকাশ মাহাত বলেন, “যে বাংলা ভাষা কথা বলার নিরিখে দেশে দ্বিতীয় এবং বিশ্বে সপ্তম, সেই ভাষায় কথা বলার জন্য আক্রমণের শিকার হতে হবে—এটা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।” যে ভাষায় ভারতের জাতীয় সংগীত রচিত, সেই বাংলা ভাষায় কথা বলায় এমন অত্যাচার কেন, উঠছে প্রশ্ন।
অন্যদিকে, বিজেপি নেতা জয়দীপ্ত চট্টরাজ ঘটনার নিন্দা করলেও বিষয়টিকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, আইন আইনের পথেই চলবে।
রাজ্যে কাজের অভাব, আর ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়ে ভাষার কারণে বাংলাদেশি তকমায় মারধরের ভয়, এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন উঠছে, কাজের সন্ধানে ভিন রাজ্যে যাওয়া শ্রমিকরা আদৌ কতটা নিরাপদ?











Post Comment