নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:
ভোটার তালিকায় নাম থাকবে তো?—এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই শনিবার সকাল থেকে পুরুলিয়া জেলাজুড়ে শুরু হয়ে গেল এসআইআরের শুনানি পর্ব। জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ এই জেলায় একদিকে যেমন প্রশাসনিক দপ্তরগুলিতে মানুষের ভিড়, তেমনই অন্যদিকে নথিপত্র হাতে নিয়ে উদ্বেগ আর আশার মিশ্র অনুভূতি।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নো ম্যাপিং বা আনম্যাপড ভোটারদের শুনানির জন্য জেলার ২৪টি কেন্দ্রে মোতায়েন করা হয়েছে ৯৯ জন আধিকারিক। জেলার ২০টি ব্লক অফিস, ৩টি মহকুমাশাসক কার্যালয় এবং জেলাশাসক দপ্তরে চলবে এই শুনানি। প্রতিটি ভোটারকে আগেই পাঠানো নোটিশে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—কোথায়, কোন দিন ও কোন সময় তাদের হাজির হতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, শুনানির সময় প্রতিটি মামলার ভিডিও রেকর্ডিং বাধ্যতামূলক। কমিশন নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য মোট ১৩টি নথিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তার মধ্যে আধার কার্ড থাকলেও, শুধু আধার দেখালেই চলবে না—সঙ্গে রাখতে হবে বাড়ির দলিল, স্কুল সার্টিফিকেট, সচিত্র পরিচয়পত্র বা অন্য সহায়ক নথি।
সকাল থেকেই জেলাশাসক দপ্তর, বিডিও অফিস ও মহকুমাশাসক কার্যালয়ে দেখা যায় লাইন। হাতে ফাইল, চোখে উৎকণ্ঠা—অনেকেই বলছেন, বছরের পর বছর ভোট দিয়েছেন, অথচ এবার খসড়া তালিকায় নাম নেই।
এই জেলায় মোট নো ম্যাপিং ভোটারের সংখ্যা ৩৭,৮২৫ জন। সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বেশি নো ম্যাপিং ভোটার রয়েছে রঘুনাথপুর বিধানসভায় (৭,৬২৯ জন)। তবে শতাংশের হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে পাড়া বিধানসভায়, যেখানে আনম্যাপড ভোটারের সংখ্যা ৩,২৭৭ জন। অন্যদিকে, খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ১ লক্ষ ৮৩ হাজার ৪১৬ জন, যার মধ্যে মৃত ভোটারের সংখ্যা ৮৭ হাজার ২২৮ জন।
পুরুলিয়া জেলায় মোট ভোটারের সংখ্যা ২৪ লক্ষ ২১ হাজার ৪৪২। উল্লেখযোগ্য বিষয়, নো ম্যাপিং তালিকায় রয়েছেন বহু জনজাতি ও মূলবাসিন্দা মানুষ, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জঙ্গলমহলে বসবাস করছেন। পুরুলিয়ার জেলাশাসক সুধীর কোন্থাম বলেন,
“আজ থেকে জেলাজুড়ে এসআইআরের শুনানি শুরু হয়েছে। ব্লক, মহকুমা ও জেলা স্তরে এই শুনানি চলবে। যাঁদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ে প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে উপস্থিত হলে তাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।”
নো ম্যাপিং ভোটারের বড় সংখ্যা ঘিরে শাসক ও বিরোধী—দুই শিবিরই সক্রিয়। শুনানি কেন্দ্রগুলির আশেপাশে অস্থায়ী ক্যাম্প করার বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
পুরুলিয়া জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সহ-সভাপতি ও বিএলএ-১ সুষেণচন্দ্র মাঝি বলেন, “কমিশনের স্বীকৃত ১৩টি নথির একটিও যদি না থাকে, তবু মহকুমাশাসকের দেওয়া স্থায়ী বাসিন্দার সার্টিফিকেট বা পাট্টার দলিল থাকলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আমরা নো ম্যাপিং ভোটারদের বুঝিয়েছি—আতঙ্কের কিছু নেই। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এখানকার বাসিন্দা ও ভোটার, তাদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকবেই।”
অন্যদিকে বিজেপির পুরুলিয়া সংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি সৌরভ সিনহার বক্তব্য, “নো ম্যাপিং ভোটারের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল। এই জেলায় অনুপ্রবেশকারীরাও রয়েছেন। চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যেন প্রকৃত নাগরিকদের নামই থাকে, সেটা নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে।”
শুনানি চলাকালীন প্রশাসনিক দপ্তরগুলিতে হাজির রয়েছেন সংশ্লিষ্ট বুথের বিএলও-রা। সচিত্র পরিচয়পত্র, আধার, বাড়ির দলিল, স্কুল সার্টিফিকেট—সব মিলিয়ে কাগজের স্তূপ নিয়েই চলছে নাম ফেরানোর লড়াই।
শুনানিতে আসা মানিকলাল মাহাতো নামের এক ব্যক্তি বলেন, “আমি এতদিন ভোট দিয়েছি। এবার নাম নেই শুনে খুব চিন্তায় পড়েছিলাম। সব কাগজ নিয়ে আজ শুনানিতে এসেছি। আশা করছি নাম ফিরে পাব।”
বিএলও মাধুরী মাহাতো বলেন, “যাদের নাম নেই, তাঁরা নথিপত্র নিয়ে আসছেন। কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী সব কিছু যাচাই করে রিপোর্ট পাঠানো হচ্ছে।”
জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে এই শুনানি পর্ব। তার দিকেই এখন তাকিয়ে পুরুলিয়ার হাজার হাজার মানুষের আশা—ভোটার তালিকায় নিজের নামটা যেন অটুট থাকে।











Post Comment