সুইটি চন্দ্র,দেবীলাল মাহাতো:
মকর সংক্রান্তির পরদিন বৃহস্পতিবার আখ্যান যাত্তার পবিত্র তিথিতে ভক্তিতে ডুবে গেল জঙ্গলমহল পুরুলিয়া। জেলার গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্রই গ্রাম্য দেবতার পুজো, আখ্যান মেলা আর লোকাচারে মুখর হয়ে উঠল জনজীবন। এই দিনে জেলার অন্যতম প্রাচীন ও জাগ্রত শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত রঘুনাথপুর-২ নম্বর ব্লকের মৌতড় গ্রামের মা বড়কালীর মন্দিরে লক্ষাধিক ভক্তের ঢল নামতে দেখা যায়।
ভোররাত থেকেই মন্দির চত্বরে শুরু হয় ভক্তদের লম্বা লাইন। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, বিহার সহ ভিন রাজ্য থেকে আসেন অসংখ্য পুণ্যার্থী। কারও হাতে পুজোর ডালি, কারও চোখে মানত পূরণের আকুতি। দীর্ঘ অপেক্ষা, ভিড়—কিছুই যেন ভক্তদের মায়ের দর্শন থেকে বিরত করতে পারেনি। সারাদিন ধরে মন্দির চত্বর ও সংলগ্ন এলাকা কার্যত ভক্তির জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
আখ্যান যাত্তা মানেই পুরুলিয়ার লোকজ সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মিলন। এই বিশেষ দিনে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে গ্রাম্য দেবতার আরাধনা করা হয়। সুখ-শান্তি, ফসলের ভাল ফলন ও অশুভ শক্তির বিনাশ কামনায় মানুষ দেবতার কাছে প্রার্থনা জানান। আখ্যান যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই বিশ্বাস আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহমান। মৌতড়ের মা বড়কালীর পুজো এই আখ্যান যাত্রার প্রধান আকর্ষণ হিসেবেই বহু বছর ধরে বিশেষ মর্যাদা পেয়ে আসছে।
আখ্যান যাত্রার পাশাপাশি পয়লা মাঘ উপলক্ষে জঙ্গলমহল জুড়ে সূচিত হল নতুন কৃষিবর্ষ। প্রাচীন রীতি মেনে গ্রামেগঞ্জে গরাম ঠাকুর সহ বিভিন্ন গ্রামদেবতার পুজোর মধ্য দিয়ে নতুন বছরের কৃষিকাজের সূচনা করলেন কৃষিজীবী মানুষ।
সকাল হতেই কৃষকেরা স্নান সেরে গোবর কেটে, জমিতে আড়াই পাক লাঙল চালিয়ে প্রতীকীভাবে চাষের শুরু করেন। অতীতে এই অঞ্চল ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। সেই সময় থেকেই কৃষিজীবী মানুষের বিশ্বাস, গ্রাম্য দেবতারাই তাদের বিপদ-আপদে রক্ষা করেন। সেই বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়েই আজও পয়লা মাঘে গ্রামে গ্রামে গরাম ঠাকুরের থানায় পুজো দেওয়া হয়। পুজোকে কেন্দ্র করে বসে মেলা, কোথাও কোথাও দেওয়া হয় পাঁঠা, মোরগ ও শূকর বলি।
তুম্বাঝালদা গ্রামের চিত্তরঞ্জন মাহাত জানান, “পয়লা মাঘ মানেই আমাদের কাছে নতুন কৃষিবর্ষের শুরু। জমিতে আড়াই পাক লাঙল চালিয়ে আমরা কৃষিকাজের সূচনা করি।”
কাশিপুর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ ক্ষীরোদ চন্দ্র মাহাতের মতে, “কৃষির সঙ্গে যাদের জীবন ও জীবিকা জড়িত, তারা আজও প্রাচীন ঐতিহ্য আঁকড়ে রেখেছেন। পয়লা মাঘ শুধু একটি দিন নয়, এটি নতুন কৃষিবর্ষের প্রতীক। এই দিনে কৃষিজীবী মানুষ হড়মিতান শ্রমিকদের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে আবদ্ধ হন এবং ভালো ফসলের আশায় গরাম ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করেন।”
ভক্তি, লোকসংস্কৃতি আর কৃষিভিত্তিক জীবনের এই মেলবন্ধনেই পয়লা মাঘ ও আখ্যান যাত্রা আজও জঙ্গলমহলের সমাজজীবনে এক অনন্য তাৎপর্য বহন করে।











Post Comment