নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া :
সব রেকর্ড ভেঙে শীতে জমে গেল পুরুলিয়া। গত দশ দিনে জেলার তাপমাত্রার গ্রাফ বলছে, এ মরশুমে নয়, গত প্রায় দু’দশকের মধ্যেই এমন কনকনে ঠান্ডা বিরল। কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৮ ও ৯ জানুয়ারি পুরুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এর আগে গত ২০ বছরে এমন নিম্ন তাপমাত্রার নজির মিলেছিল মাত্র হাতে গোনা কয়েক বার। বিশেষ করে ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর ৪.৭ ডিগ্রি ছিল দীর্ঘদিনের রেকর্ড—এ বার তা ভেঙে গিয়েছে।
গত দশ দিনের তাপমাত্রার দিকে তাকালে স্পষ্ট, নতুন বছরের শুরু থেকেই পুরুলিয়ায় শীত ক্রমশ তীব্র হয়েছে।
৪ জানুয়ারি কৃষি দপ্তরের হিসেবে সর্বনিম্ন ছিল ৭ ডিগ্রি।
৫ জানুয়ারি তা নেমে আসে ৫ ডিগ্রিতে।
৬ জানুয়ারি সর্বনিম্ন রেকর্ড হয় ৪.৩ ডিগ্রি।
৭ জানুয়ারি ছিল ৪.৪ ডিগ্রি।
৮ ও ৯ জানুয়ারি পারদ স্থির হয় ৪ ডিগ্রিতে, চলতি মরশুমের শীতলতম।
কৃষি দপ্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, শনিবার ১০ জানুয়ারি জেলায় বৃষ্টিপাত হয়নি। এ দিন পুরুলিয়ায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন নেমে গিয়েছে ৫.১ ডিগ্রিতে।
গত দশ দিনের তাপমাত্রাও ছিল স্বাভাবিকের নীচে। গত দশ দিনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করেছে ১৯ থেকে ২২ ডিগ্রির মধ্যে। ৪ জানুয়ারি দিনের সর্বোচ্চ নেমে গিয়েছিল ১৯ ডিগ্রিতে, যা জানুয়ারির শুরুতে অস্বাভাবিক বলেই মত আবহাওয়াবিদদের।
তবে এই চরম শৈত্যপ্রবাহের ছবি পুরোপুরি ধরা পড়ছে না আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের বুলেটিনে। কারণ হিসেবে উঠে আসছে পুরুলিয়া সার্কিট হাউসের পিছনে থাকা আবহাওয়া দপ্তরের তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রের ত্রুটি। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, যন্ত্র খারাপ থাকার কথা জানানো হলেও তা সারাতে এখনও কেউ আসেনি। ফলে আলিপুরের রিপোর্টে পুরুলিয়ার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা অনেক দিনই ৯–১০ ডিগ্রি দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, হাতোয়াড়ায় খোলা এলাকায় থাকা কৃষি দপ্তরের যন্ত্রে মিলছে বাস্তবের কাছাকাছি ছবি।
এই কারণেই সরকারি নথিতে শ্রীনিকেতন, সিউড়ি বা বর্ধমান শৈত্যপ্রবাহের আওতায় এলেও, বাস্তবে আরও ঠান্ডা থাকা সত্ত্বেও পুরুলিয়ার নাম অনেক সময়ই নেই তালিকায়—যা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, পরিষ্কার আকাশ, মেঘহীন রাত এবং উত্তুরে হাওয়ার জেরেই পুরুলিয়ায় রাতের তাপমাত্রা এতটা নেমে যাচ্ছে। দিনে রোদ উঠলেও সেই একই মেঘমুক্ত পরিবেশ রাতের ঠান্ডা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ৪ ডিগ্রি ঠান্ডাতেই ঝালদায় দেখা গেছে গ্রাউন্ড ফ্রস্ট। শুক্রবার ভোরে ঝালদা-খামার যাওয়ার রাস্তার ধারে খড়ের গদার উপর জমে ওঠে সাদা আস্তরণ। প্রথম দেখায় অনেকেই একে বরফ বলে মনে করলেও কাছে গিয়ে দেখে এটি আসলে ভূমি তুষার। প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে এই বিরল দৃশ্য প্রথম লক্ষ্য করেন এবং মুহূর্তের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমতে শুরু করে। অনেকেই মোবাইলে ছবি তুলে রাখেন এই অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক দৃশ্যের। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, পরিষ্কার আকাশ ও মেঘহীন রাতে মাটির তাপ দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে উত্তুরে শুষ্ক হাওয়া এবং প্রায় নিস্তব্ধ বাতাস পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করছে। এই অবস্থায় বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প সরাসরি বরফে পরিণত হয়ে খড়ের গায়ে জমছে। খড় হালকা ও আঁশযুক্ত হওয়ায় তা খুব দ্রুত ঠান্ডা হয়ে পড়ে এবং আর্দ্রতা আটকে রাখে, ফলে মাটির তুলনায় খড়ের উপর ফ্রস্ট আগে দেখা যায়।
সব মিলিয়ে, গত দশ দিনে পুরুলিয়ায় যে শীতের দাপট দেখা গেল, তা শুধু চলতি মরশুমেই নয়—গত ২০ বছরের আবহাওয়ার ইতিহাসেও উল্লেখযোগ্য। কাগজের হিসেব যাই বলুক, ভোররাত আর সকালের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় জেলাবাসীর অভিজ্ঞতায় এটাই এখন প্রশ্নাতীত ভাবে শৈত্যপ্রবাহ।









Post Comment