দেবীলাল মাহাত, আড়শা:
কনকনে শীতকে উপেক্ষা করেই অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি থেকে জঙ্গলমহল জুড়ে সূচনা হল ‘টুসু’ উৎসবের। প্রাচীন কাল থেকে সাবেক মানভূমের কাছে দিনটি ‘শুভ’ হিসাবে পরিচিত । এদিন কুমারী মেয়েরা প্রতিষ্ঠা করে টুসু। মাঠের ফসল ঘরে তোলার পর,শুরু হয় টুসুর আরাধনা। তুলসী মঞ্চের একপাশে গর্ত খুঁড়ে পাতানো হয় টুসু। আবার কেউ ঘরের কুলুঙ্গীতে বা বাড়ির এক কোনে টুসুর অবয়ব বানিয়ে, গাঁদা ফুল দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে ‘টুসু’র। একমাস ধরে রোজ সন্ধ্যায় পাড়ার মেয়েরা একটি করে গাঁদা ফুল দিয়ে টুসুকে জাগিয়ে রাখে । সঙ্গে মেয়েরা সমবেত হয়ে টুসু গান করে। যার সমাপ্তি ঘটে পৌষ সংক্রান্তিতে টুসুকে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে।
সাবেক মানভূমের মানুষের কাছে এই উৎসব ‘মকর পরব’, ‘পৌষ পরব ‘ নামে পরিচিত। সময়ের সঙ্গে জীবন যাত্রায় বদল ঘটলেও প্রাচীন রীতি রেওয়াজ এখনও রয়েছে। কৃষকদের কাছেও দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে আমন ধান বাড়িতে তোলার শেষ দিন। জমিতে সযত্নে রাখা এক মুঠো বিজোড় ধান গাছি মাথায় করে নিয়ে আসেন। সেই ধান গাছি খামারে পীঁড়ার উপর রাখা হয়। যাকে বলা হয় ‘ঠাকুর মাঞ্’ । বাড়িতে বানানো হয় ‘পিঠা’- লাউ পিঠা,শিম পিঠা, আইসকা পিঠা বা খাপইর পিঠা। এইসময় কদর বাড়ে টেঁকিরও।
‘টুসু’ উৎসব পুরুলিয়া, বাঁকুড়া সহ সাবেক মানভূম এলাকার মানুষের লোক মহোৎসব। পুরো মাস জুড়ে টুসুকে আরাধনা করার পর পৌষ সংক্রান্তিতে পরিসমাপ্ত হয় । বিসর্জন দেওয়া হয় টুসুকে। এদিন নদী সহ জলাশয় গুলিতে বসে মেলা। রং- বেরঙের চৌডলে রঙিন হয়ে ওঠে জলাশয়গুলি। টুসু গানে মুখরিত হয়ে ওঠে মানভূমের আকাশ, বাতাস। মেলাতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। সাবেক মানভূমে এদিন জাতীয় উৎসবের চেহারা নেন। পৌষ মাসের শেষ তিন দিন আঁউড়ি, বাঁউড়ি,ও মকর নামে পরিচিত। আড়শা ব্লকের বামুনডিহা গ্রামের কনিকা মাহাতো, তুম্বা ঝালদা গ্রামের মৌসুমী মাহাতোরা বলেন, “অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে আমরা টুসুকে ঘরে স্থাপন করলাম। এরপর প্রতিদিন টুসুকে বিভিন্ন ধরনের ফুল দিয়ে টুসু গীত গেয়ে জাগিয়ে রাখবো।” দেউলবেড়া দশগ্রাম মেলা কমিটির সম্পাদক চিত্তরঞ্জন মাহাত জানান, “মকর সংক্রান্তির দিন কংসাবতী নদীর তীরে দেউলবেড়াতে দশটি গ্রামের মানুষ মেলার আয়োজন করে থাকে। প্রচুর মানুষের সমাগমে মেলা প্রাঙ্গণ মিলনরূপ ধারণ করে। সকলে নিজেদের সংস্কৃতিতে মেতে ওঠে।” সিধো-কানহো- বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিত বিভাগের অধ্যাপক তথা কুড়মালি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডঃ সনৎকুমার মাহাত বলেন, ” অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি দিনটি মানভূমের কৃষিজীবী মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিভিত্তিক উৎসবটি অগ্রহায়ণ থেকে শুরু হয়ে পৌষ সংক্রান্তিতে শেষ হয়। এই সময় কৃষিজীবী মানুষ লক্ষ্মীকে বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন। মেয়েরা প্রতিটি বাড়িতে পাতে টুসু। মকর সংক্রান্তির দিন জেলার বিভিন্ন প্রান্তে নদী,জলাশয়ে বসে মেলা।”











Post Comment