insta logo
Loading ...

ফিরতে পারে ? ৭২ ঘন্টার উৎকণ্ঠায় বাংলার বন দফতর

ফিরতে পারে ? ৭২ ঘন্টার উৎকণ্ঠায় বাংলার বন দফতর

সুজয় দত্ত ও বিশ্বজিৎ সিং সর্দার :

জিনাতও বাংলার জঙ্গলে ছিল ৮ দিন, তার আশিক রয়্যাল বেঙ্গলও থাকল ৮ দিনই। এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে সে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়িয়েছে তার কিশোরীকে। আর তাকে বাগে আনতে হিমসিম খেয়েছে বাংলার বন দফতর৷ শেষ পর্যন্ত টানা ৪৮ ঘন্টার বাঘবন্দি অভিযানে লাগাতার পটকার দুমদাম আর হুলা পার্টির চিল চিৎকারে রীতিমতো বিরক্ত হয়েই সোমবার ভোর ভোর সে আবার ঝাড়খন্ডে ফিরে গেলো। ঠিক যে পথ দিয়ে সে বাংলায় এসেছিল সেই পথ দিয়ে দলমা অভয়ারণ্য লাগোয়া জামশেদপুর বনবিভাগের ঘাটশিলা বনাঞ্চলে ঢুকে যায় জিনাতের আশিক।

ঝাড়খন্ড বনবিভাগ জানাচ্ছে, সোমবার বিকাল পর্যন্ত ঘাটশিলা বনাঞ্চলের কালাঝোর এলাকায় রয়েছে সে। মিলেছে রয়্যালের পাগ মার্ক। জামশেদপুর বনবিভাগের ডিএফও সাবা আলম আনসারি জানান, ” বাঘটি এখন জামশেদপুর বনবিভাগে রয়েছে। আমরা তার পায়ের ছাপ পেয়েছি। মানুষজনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। আমরা ধারাবাহিক নজরদারি চালাচ্ছি।”

কীভাবে ঝাড়খণ্ডে গেল জিনাতের আশিক? পায়ের ছাপ খুঁজে খুঁজে রুট ম্যাপ তৈরি করেছে বন দফতর। বান্দোয়ানের কাঁটাপাহাড় থেকে তার প্রথম গন্তব্য ছিল ঝাড়খণ্ডের পটমদা থানার বুড়াবুড়ি পাহাড়। সেখান থেকে গোবরঘুষি, বাটালুকার গ্রাম হয়ে পাশের জঙ্গলে যায়। বাটালুকা গ্রামের এক গৃহস্থের ঘর থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে সোমবার সকালে বাঘটির পায়ের ছাপ দেখে ঝাড়খন্ড বনবিভাগ। তাদেরকে সেই ছাপ দেখান বাটালুকা গ্রামের বাসিন্দা যুধিষ্ঠির মেহতা। তিনি বলেন, ” আমি সবার প্রথমে এই এলাকায় বাঘের পায়ের ছাপ দেখি। আমার বাগানের মধ্যে ওই ছাপ দেখে আতঙ্কেই ছিলাম। পড়োশিদের দেখাই। জানানো হয় ফরেস্টেও।” এরপরেই বাঘ থেকে সতর্ক থাকার প্রচার চালাতে থাকে বন দফতর।

তবে বান্দোয়ানের কপালে বাঘের ফাঁড়া এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এখন সে যে জঙ্গলে রয়েছে বাংলা থেকে তার দূরত্ব মাত্র ৩-৪ কিলোমিটার। দিন কয়েক ধরে সে বারবার বান্দোয়ানের রাইকা পাহাড়ের কাছে ভাঁড়ারি ও যমুনাগোড়াতেই ফিরে আসছিল। সেই এলাকায় ২ দিন ধরে ট্র্যাপ ক্যামেরায় ধরা পড়েছে সে। ফলে এখনই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন না বাংলার বন কর্তারা। পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রেখেছেন তাঁরা।

টানা আটচল্লিশ ঘন্টার বাঘবন্দি অপারেশনের শেষ পর্যায়ে রবিবার কাঁটাপাহাড় এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চলে। জিনাতের আশিক ঠিক কোথায় থাকতে পারে আন্দাজ করে দুদিক থেকে তার দিকে পটকা ফাটিয়ে আসতে থাকে বাঘ বন্দি দলের বিশাল বাহিনী। পাশাপাশি যমুনাগোড়ার জঙ্গলে গাছে মাচা বেঁধে সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের শ্যুটাররা অ্যামবুশ করেছিলেন। কিন্তু রবিবার রাতে আর সেখানে আসেনি জিনাতের আশিক। অন্যদিকে শনিবার সকালে ট্র্যাপ ক্যামেরার পাশে সে এসে দুটো ছবি তোলালেও তার পাশে রাখা খাঁচায় থাকা ছাগলের টোপে ভোলেনি। সেই টোপের চারপাশে আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে বাঘিনীর মূত্র নিয়ে এসে স্প্রে করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য সফল হয়নি। আকর্ষিত হয়নি প্রেমিক শার্দূল। সে যে জিনাতকেই খুঁজছে এ বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত ব্যাঘ্র বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাঘটি যে জিনাতকে খুঁজছে তা বোঝা যাচ্ছে জিনাতের ফেলে আসা পথে বারবার তার ঘুরে বেড়ানোতে। সাঁড়াশি অভিযান না হলে হয়তো ওই রয়্যাল বেঙ্গল রাইকা পাহাড় ও পাহাড়তলি ছেড়ে যেতই না।

তবে সে যে আপাতত বাংলা ছেড়েছে তাতে খানিকটা স্বস্তি পেয়েছে বাংলার বন দফতর। বাংলা ছেড়ে বাঘের ঝাড়খন্ডমুখী হওয়ার পায়ের ছাপও সংগ্রহ করেছে তারা। ৪৮ ঘণ্টার সাঁড়াশি অভিযান সোমবার বিকালে আনুষ্ঠানিক ভাবে শেষ হলেও চলবে ৭২ ঘন্টার নাইট ওয়াচিং। বনাধিকারিকরা সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন পরিস্থিতির দিকে। থাকবেন সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের বিশেষজ্ঞরাও।

বাঘবন্দি অভিযানের তত্ত্বাবধানে থাকা রাজ্যের মুখ্য বনপাল (পশ্চিম চক্র) সিঙ্গরম কুলান ডাইভেল বলেন, ” জিনাতের পথ ধরে যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটি বাংলায় এসেছিল। সেটি আবার ঝাড়খন্ডে ফিরে গিয়েছে। ঝাড়খন্ডে যাওয়ার তার যেমন পদচিহ্ন মিলেছে। তেমনই ঝাড়খণ্ডের ঘাটশিলা বনাঞ্চল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন ওই এলাকায় থাকা বাঘের পায়ের ছাপ থেকে তারা নিশ্চিত ওই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটি সেখানেই রয়েছে। অভিযান আপাতত বন্ধ হলেও ৭২ ঘন্টা নজরদারি চলবে। সুন্দরবন ব্যাঘ্র বিশেষজ্ঞ টিমও বান্দোয়ানে থাকছেন।”

জিনাত ওরফে গঙ্গা

কারণ সে যে জিনাতের পথ ধরে আবার ফিরবে না তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কংসাবতী দক্ষিণ বনবিভাগ। সে তো আর জানে না তার ‘মেঘবালিকা’ এখন দূর সিমলিপালে। তার নামও পালটে গেছে। সে বলেছে,
“..আর হ্যাঁ, শোন-এখন আমি
জিনাত নই আর, সবাই এখন
গঙ্গা বলে ডাকে আমায়।”

Post Comment