নিজস্ব প্রতিনিধি ,আড়শা:
আড়শা থানার করন্ডি গ্রামে চাঞ্চল্যকর ঘটনা। যাঁকে পরিবার ও গ্রামবাসী ৪২ বছর আগে মৃত বলে ধরে নিয়েছিলেন, সেই অনিল কুমারই ফিরলেন ঘরে—জীবিত। হঠাৎ ফিরে আসা এই মানুষকে ঘিরে বিস্ময়, আবেগ ও আনন্দে ভরে উঠেছে গোটা এলাকা।
বর্তমানে ৫৮ বছরের অনিল কুমার কৈশোরে অভাবের তাড়নায় কাজের সন্ধানে পাড়ি দিয়েছিলেন তৎকালীন বিহারের ধানবাদে। ১৯৮৪ সালের ৩০ অক্টোবর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শিখ দাঙ্গা। সেই সময় ধানবাদে কাজ করতেন অনিল। দাঙ্গার পর থেকেই নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। পরিবার বহুদিন ধরে খোঁজাখুঁজি চালালেও কোনও সন্ধান মেলেনি। থানা-পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও লাভ হয়নি। শেষমেশ পরিবার ও গ্রাম ধরে নেয়, দাঙ্গার মধ্যেই নিশ্চয় কোনও অঘটন ঘটেছে—অনিল আর বেঁচে নেই।
শনিবার হঠাৎই করন্ডি গ্রামে পা রাখেন অনিল। ঘরের ছেলে ফিরলেও বাবা-মা ও সেজো ভাই—চার দশকের ব্যবধানে সকলেই প্রয়াত। ভিটেমাটি আর স্মৃতিই আজ সাক্ষী হয়ে রয়েছে সেই সময়ের।
অনিলের জীবনকাহিনি যেন রহস্য উপন্যাসকেও হার মানায়। জেঠতুতো দাদা রাধানাথ কুমার ও বাদল কুমারের হাত ধরে তখনকার বিহারের কাতরাসে এক ইসিএল আধিকারিকের বাংলোতে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু শিশু শ্রমিক অনিলের সেখানে মন টেকেনি। পরে ধানবাদের ছাতাবাদের একটি গ্রিল কারখানা ও সেখান থেকে লেদ কারখানায় কাজ পান। কাজ চলছিল তিন মাস। ঠিক তখনই দাঙ্গা। ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন অনিল।
এরপর বোকারোতে একটি মিষ্টির দোকানে কাজ, সেখান থেকে কলকাতার ফুটপাতে আশ্রয়। সেই সময় মানসিক ভারসাম্যও হারান তিনি। পরে সিঙ্গুরের একটি ধাবা এবং হুগলির নসিবপুরে আরেক ধাবায় কাজ পেয়ে ধীরে ধীরে স্থির হন। সেখানেই সংসার পাতেন। হয় বিয়ে, জন্ম নেয় ছেলে-মেয়ে। তবে নিজের শিকড়ের কথা কোনওদিন অস্বীকার করেননি অনিল। শুধু সাহস হয়নি ফিরে আসার।
অনিল জানিয়েছেন, মকর-পরব পর্যন্ত তিনি গ্রামেই থাকবেন। তারপর ফিরবেন হুগলির নসিবপুরে, যেখানে বর্তমানে তার মাছের ব্যবসা। তবে ৪২ বছরের ব্যবধানে শিকড়ের টানে ফিরে এসে গ্রাম যে আর অচেনা নয়, তা কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝে গিয়েছেন তিনি।
করন্ডি গ্রামে আজ একটাই কথা—যাঁকে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, তিনি ফিরে এসেছেন। সময়ের ওপার থেকে। খুশি পরিবার, খুশি গ্রাম।











Post Comment