insta logo
Loading ...
×

নিরুদ্দেশে ‘রাতকহনি’

নিরুদ্দেশে ‘রাতকহনি’

দেবীলাল মাহাত, আড়শা:

বসন্ত এলেই ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে ওঠে রুখাশুখা পুরুলিয়া। ফি বছর প্রকৃতিও আপন রঙিন সাজে ‘নববসন্তের ডালি’ নিয়ে হাজির হয় দুয়ারে। রাতে জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো এসে পড়ে বাড়ির আঙিনায়। এক দশক আগেও সেই আলোতে ঠাকুরমা, ঠাকুরদারা ছেলে ভুলানো ছড়া থেকে ঘুমপাড়ানি গান , প্রবাদ প্রবচন,’রাত কহিনি’তে বাড়ির আঙিনাতে আসর বসাতেন । সেই রূপকথার কাহিনী শুনে কল্পনার জগতে চলে যেতেন শিশুরা। তা শুনে নানা প্রশ্ন উঁকি জাগতো তাদের মনে। বিকাশ হতো শিশু মনের কল্পনা শক্তির। তবে সে আর দিন নেই। আধুনিকতার যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে মানভূমের প্রাচীন লোককথা’ রাত কহিনি ‘।

মানভূম সংস্কৃতিতে ‘রাত কহনি ‘ প্রকৃতি, পরিবেশকে বোঝানোর একটি মাধ্যম। ছোট থেকে বিভিন্ন জিনিসকে চেনানোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কল্পনাপ্রসূত সেই রূপকথার কাহিনীগুলো মনোরঞ্জনের জন্যই বলা হতো। অতি প্রাচীনকাল থেকেই তা মুখে মুখে চলে আসছে। বলার ভঙ্গি শ্রোতার মনকে আরও আকৃষ্ট করে তুলতো। এক দশক আগেও সন্ধ্যা নামলেই বয়স্ক মানুষেরা ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ির আঙিনায় আসর বসাতেন। শিশুরাও তা শোনার অধীর অপেক্ষায় থাকতো। তারপর শুরু হতো ‘কহনি’ বলা। যা চলতো রাত এগারো-বারোটা পর্যন্ত। কহনি শুনে শুনে ঘুমিয়ে পড়তেন শিশুরা । দু’ধরনের কহনি ছিল – ভাঙ্গা কহনি ও বলা কহনি। বয়স্ক মানুষেরা খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে শিশুদের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দিতো ? বলতো “একথাল সুপারি,গুনতে লারে ব্যাপারী”,” ঘর আছে তো,দুয়ার নাই” । এই সব অজস্র রাত কহনি। তা শোনার পরেই শিশু মনে ভাবনা আসতো । ভাবনা থেকেই তাদের মনের বিকাশ ঘটতো। উন্মেষ হতো গভীর জ্ঞানের।

আধুনিক সভ্যতার সর্বগ্রাসী প্রভাবে ‘রাত কহনি’ ক্রমশ লোকসমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। সেই জায়গায় দখল করেছে আধুনিক যন্ত্র দানব মোবাইল, টেলিভিশন। শিশুদের ঘুমানোর জন্য আর ঘুমপাড়ানি গান, রাত কহনি লাগে না। টিভির পর্দায় চোখ রেখে, স্মার্টফোনে কার্টুন,রিলস দেখে ঘুমিয়ে পড়ে শিশুরা। আড়শা ব্লকের তুম্বাঝালদা গ্রামের কল্পনা মাহাত জানান, “ঠাকুরমা আমাদের ঘুমপাড়ানি গান,রাত কহনি শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন। সন্ধ্যা নামলেই তা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকতাম। ধীরে ধীরে সে সব হারিয়ে যেতে বসেছে।”

কাশিপুর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক ডঃ ক্ষীরোদ চন্দ্র মাহাত জানান, “প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত এই রাত কহনি মানভূমের মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। বর্তমান উন্নত প্রযুক্তির যুগে রাতকহনি অপাংক্তেয় হয়ে পড়েছে। বিলুপ্তির পথে পা বাড়িয়েছে এই লোক কথা।
রাতকহনি শুনে শুনেই শিশুমনের কল্পনার শক্তির বিকাশ হতো। বিভিন্ন প্রশ্ন জাগতো মনে। যা আজও প্রাসঙ্গিক।”

Post Comment