সুজয় দত্ত ও বিশ্বজিৎ সিং সর্দার :
উড়ছে ড্রোন। সঙ্গে স্মার্ট ক্যামেরা। নাইট ভিশন বসানো হয়েছে। আর…? সুন্দরবন থেকে এসে পৌঁছেছে জিনাত জয়ী টিম। নেতৃত্বে সেই সজনেখালি বিট অফিসার মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস। সুন্দরবন মডেলেই জিনাতের আশিক বাঘকে বন্দি করার ফন্দি এঁটেছে বন বিভাগ।

জিনাতের গলায় ছিলো রেডিও কলার। ফলে শ্যাডো জোনে সে না থাকলে তার হদিশ পাচ্ছিল বন দফতর। জিনাতের আশিকের গলায় রেডিও কলার নেই। উপরন্তু সে জিনাতের সন্ধানে গত ২৪ ঘন্টায় ১৪ থেকে ১৬ কিমি ব্যাসার্ধ জুড়ে শুধু পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম নয়, বাঁকুড়া ছুঁয়েও চরকিপাক খাচ্ছে। আর চরকিপাক খাওয়াচ্ছে বন দফতরকেও। বাংলাতে এসেও জিনাতের ফেলে যাওয়া পথেই চলছে আশিক। তাকে ট্র্যাক করতে কেবল তার পায়ের ছাপ, কখনও মল বন বিভাগের অস্ত্র। সোমবার পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এই তিন জেলায় ধানের জমি, মাঠ, ধুলোপথে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটির অসংখ্য পদচিহ্ন মেলে। কংসাবতী দক্ষিণ বন বিভাগের বান্দোয়ান ১ নং বনাঞ্চলের রাইকা, উদলবনি, যমুনাগোড়া এবং যমুনা বনাঞ্চলের গোলকাটা,
বাঁকুড়া বনাঞ্চলের লাউপালে বাঘের পায়ের ছাপ দেখা যায়। রবিবার রাতে জুজারধরার কাছে জঙ্গল পথে বাঘের বিষ্ঠাও পাওয়া যায়। বন বিভাগ জানিয়েছে, ওই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটি একেবারে কাঁকড়াঝোর পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। পায়ের ছাপ দেখেই সেই সিদ্ধান্তে আসে বন দফতর। বাঁশপাহাড়ি বনাঞ্চলের বগডোবা, মনিয়াডি, জুজারধরাতে ৫০ টি নাইট ভিশন ট্র্যাপ ক্যামেরা বসানো হয়েছে। একইভাবে পুরুলিয়ার কংসাবতী দক্ষিণ বনবিভাগের বান্দোয়ান ১ নং ও যমুনা বনাঞ্চলে সোম ও মঙ্গলবার মিলিয়ে ১৫ টি ট্র্যাপ ক্যামেরা বসানো হবে। ঝাড়গ্রামের বাঁশপাহাড়ি রেঞ্জে মোষের টোপ দিয়েছিল বনবিভাগ। কিন্তু তাতে ধরা দেয়নি জিনাতের আশিক।

দফায় দফায় বৈঠকে বসে বন কর্তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে এই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটির মনস্তত্ত্ব বুঝে তাকে কব্জা করতে হবে। এক্ষেত্রে সুন্দরবন মডেলের উপরই ভরসা রাখছে অরণ্য ভবন। সে কারণেই জিনাতকে ঘুমপাড়ানি গুলিতে কাবু করেছিল যে টিম, সুন্দরবনের সজনেখালি বিট অফিসার তথা শ্যুটার মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসের নেতৃত্বে ৫ জনের সেই দলটি সোমবার রাতে ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়িতে পৌঁছায়। বাঘের যাতায়াতের গতিপ্রকৃতি বুঝে তাকে কাবু করার ব্লু প্রিন্ট সাজাবেন তারা। সজনেখালি বিট অফিসার মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসের নেতৃত্বে বাকি যে চারজন সদস্য রয়েছেন তারা হলেন বনরক্ষী রাজীব নস্কর, অরণ্যসাথী কালিপদ গায়েন, শম্ভু দাস, বন্যপ্রাণি চিকিৎসক শঙ্কর শেখর বিশ্বাস। তাঁরা সঙ্গে এনেছেন ৫০০ মিটার ঘেরার জন্য পর্যাপ্ত জাল, তিনটি খাঁচা এবং দুটি ঘুমপাড়ানি বন্দুক।
পুরুলিয়া বনবিভাগের ডিএফও অঞ্জন গুহ বলেন, “আমরা মানুষজনকে বোঝাচ্ছি আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। আমরা পাশে আছি। “

গত বছরের ২২ ডিসেম্বর পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের রাইকা পাহাড়ের জঙ্গলে ঢুকে পড়ে রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনী জিনাত। ওড়িশার সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্প থেকে ঝাড়খণ্ড, ঝাড়গ্রাম হয়ে পুরুলিয়া আসে সে। ২৯ তারিখ তাকে বাঁকুড়ার রানিবাঁধের গোঁসাইডি এলাকায় ঘুমপাড়ানি গুলি ছুঁড়ে কাবু করা হয়। সেখান থেকে কলকাতা হয়ে ১ জানুয়ারি ওড়িশার সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্পে নিজের বাড়িতে ফিরে যায় জিনাত। আর সেদিনই পুরুলিয়া সীমান্তে ঝাড়খণ্ডের সরাইখেলা-খরসোঁওয়া জেলার চাণ্ডিল শহর সংলগ্ন চৌকা থানার তুল গ্রামের বালিডি জঙ্গলে দেখা মেলে এই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটির। ব্যাঘ্র বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওড়িশা থেকে পুরুলিয়া আসার দীর্ঘ পথে কোথাও এই বাঘটির সঙ্গে দেখা হয়ে থাকতে পারে জিনাতের। আর তার টানেই ঠিক জিনাতের ফেলে আসা পথে চরকিপাক খাচ্ছে তার আশিক।
যেন গেয়ে চলেছে জিনাত আমানের আজনবি সিনেমার সেই সুপারহিট গান, ” এক আজনবি হাসিনা সে ইউঁ মুলাকাত হো গয়ি”।
ফির ক্যায়া হুয়া? ল্যাজেগোবরে হতে হচ্ছে বন দফতরকে।
রাজ্যের মুখ্য বনপাল (দক্ষিণ-পশ্চিম চক্র) বিদ্যুৎ সরকার বলেন, “জিনাতকে যারা কাবু করেছিলেন সেই সুন্দরবনের টিমকেই নিয়ে আসা হয়েছে।”
সুন্দরবনের টিমে জিনাত জয়ী ওই বিট অফিসার মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস বলেন, ” কোন এলাকায় বাঘের অবস্থান, সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে আমরা সেখানকার পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাঘের মনস্তত্ত্ব বুঝে পদক্ষেপ নেবো।”



Post Comment