নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:
দোল-হোলির রঙ, পলাশের আগুনরাঙা বন আর বুদ্ধ পূর্ণিমার সেন্দ্রা—এই তিন আকর্ষণ ঘিরে আগামী তিন মাসে পর্যটকের ঢল নামতে চলেছে পুরুলিয়ায়। সেই ভিড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে অযোধ্যা পাহাড় ও সংলগ্ন বনাঞ্চল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাড়তি চাপ সামলাতে এবার প্রশাসন আগে থেকেই সক্রিয়। বন, পুলিশ, আবগারি, দমকল, বিদ্যুৎ, সাধারণ প্রশাসন ও আরপিএফ—মোট ছ’টি দপ্তরকে নিয়ে বিস্তৃত সমন্বয় বৈঠকে তৈরি হয়েছে পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা।
পর্যটনের শীর্ষ মরশুমে যাতে প্রকৃতি ও মানুষ—দু’পক্ষই নিরাপদ থাকে, সেজন্য প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো জোরদার—বহুমুখী প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ড্রোনে নজরদারি, নাইট ভিশন ক্যামেরা, ১৯টি রেঞ্জে কন্ট্রোল রুম, কুইক রেসপন্স টিম—সব মিলিয়ে বনাঞ্চলকে ‘রিয়েল-টাইম মনিটরিং’-এর আওতায় আনা হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে অযোধ্যা পাহাড়ের বামনি ফলস-সহ একাধিক ‘কোর এরিয়া’-য় পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ও হুল্লোড়ের অভিযোগ উঠেছিল। পাশাপাশি, বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও বেড়েছে—রায়তি জমি মিলিয়ে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা প্রায় সেঞ্চুরির মুখে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে এ বছর তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে, ফলে আগুনের ঝুঁকিও বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে দোল থেকে সেন্দ্রা পর্যন্ত বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
সমন্বয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত দোল-হোলি উপলক্ষে তিনটি বনবিভাগ—পুরুলিয়া, কংসাবতী উত্তর ও কংসাবতী দক্ষিণে—সমস্ত কর্মী-আধিকারিকের ছুটি বাতিল থাকবে। স্পর্শকাতর এলাকাগুলিকে চিহ্নিত করে ‘ভালনারেবল এরিয়া ম্যাপিং’ করা হচ্ছে। ওই সব জায়গায় বনকর্মী, পুলিশ ও আবগারি দপ্তরের যৌথ টহল ও আকস্মিক অভিযান চলবে, প্রয়োজনে নৈশ অভিযানও। ডিএসপি পদমর্যাদার আধিকারিকের তত্ত্বাবধানে এই অভিযানের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
জঙ্গলে মাদকাসক্তি, দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ বা অনিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পিং রুখতে আবগারি ও পুলিশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ঘুরতে এসে কতটা মদ খাচ্ছেন পর্যটকরা, তা জানতে প্রয়োজন পড়লে ব্রিদিং অ্যানালাইজার যন্ত্র ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল, কটেজ ও রিসর্টে গিয়ে বনাঞ্চলে কী করা উচিত আর কী উচিত নয়, সে সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হবে। হাতি বা অন্যান্য বন্যপ্রাণের গতিবিধি সম্পর্কেও আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হবে পর্যটকদের।
স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দোল থেকে সেন্দ্রা পর্যন্ত জেলার সমস্ত রেঞ্জ কার্যালয়কে অস্থায়ী ‘হসপিটাল ইউনিট’-এ রূপান্তরিত করা হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা, স্যালাইন, অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা থাকবে। বনকর্মী অগ্নিনির্বাপণে জখম হলে বা পর্যটক অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যাবে। প্রতিটি ইউনিটে অন্তত একটি শয্যার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
বনাঞ্চলে যত্রতত্র ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তার সরাতে বিদ্যুৎ দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে,প্রয়োজনে বনকর্মীরা সহায়তা করবেন। একইসঙ্গে স্টেশনগুলিতে মাইকিংয়ের মাধ্যমে আরপিএফ বনদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে বন্যপ্রাণ রক্ষায় প্রচার চালাবে।
পুরুলিয়া বনবিভাগের ডিএফও অঞ্জন গুহ বলেন, “দোল-হোলি, পলাশের মরশুম ও বুদ্ধ পূর্ণিমার সেন্দ্রাকে সামনে রেখে একাধিক দপ্তরকে নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে এবং সেখান থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে”।



Post Comment