নিজস্ব প্রতিনিধি, নিতুড়িয়া :
শাটার খুলে ঘরে ঢুকতেই পুলিশের চক্ষু চড়ক গাছ। ঝাঁ চকচকে কয়েকশ বর্গফুটের গোডাউন। সারি সারি কাগজের বাক্সতে সাজানো রয়েছে একাধিক বিদেশী ব্র্যান্ডের মদ। কত মদ? হিসেব করতে কালঘাম ছুটে যায় পুলিশের।আগেই রঘুনাথপুর এসডিপিও রোহেদ শেখের নেতৃত্বে বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলে এলাকা। উঁচু পাঁচিল ঘেরা ওই গোডাউনের এক পাশে শত শত প্লাস্টিকের ড্রাম। তাতে মদ তৈরির কাঁচা মাল মজুত। পাশে সারি সারি হরেক রকম মদের বোতল ও লেবেল। পুলিশ বুঝতে পারে এটি নকল বিলিতি মদ তৈরির কারখানা। আনুমানিক ৭৫ হাজার বোতল নকল মদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

ঘটনাস্থল পুরুলিয়া জেলার নিতুড়িয়া থানার সরবড়ি গ্রামের অদূরে পাঞ্চেত সড়কের ধরে একটি গোডাউন।
জনবহুল এলাকায় রাস্তার পাশে পেট্রোল পাম্প। তার পাশেই এক ছাদের তলায় ছ’টি শাটার বন্ধ দোকান ঘর। পাশেই বড় লোহার গেট দিয়ে ঢোকার রাস্তা। মঙ্গলবার বিকেলে গোপন সূত্রে নিতুড়িয়া থানার পুলিশ জানতে পারে ওখানে চলছে নকল বিলিতি মদের কারখানা। সেখানে হানা দিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল মদ ও মদ তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ। চারজন মহিলা সহ ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এক নাবালিকাকেও। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে ধৃতদের আট জনের বাড়ি ঝাড়খণ্ডের জামতাড়া এলাকায় ও একজনের বাড়ি দুমকা এলাকায়।পুলিশ আধিকারিকদের অনুমান এই ঘটনায় একটি বড় চক্র কাজ করছে।

উদ্ধার হওয়া নাবালিকাকে বুধবার শিশু সুরক্ষা কমিটির মাধ্যমে সরকারি হোমে পাঠানো হয়। পুরুলিয়া পুলিশ সুপার অভিজিত বন্দোপাধ্যায় বলেন,” গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ নকল মদের কারখানায় হানা দেয়। ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ নকল মদ ও মদ তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার হয়। এক নাবালিকাকে উদ্ধার করার পাশাপশি ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এই চক্রের বাকিদের খোঁজ শুরু হয়েছে।”

বুধবার ধৃতদের রঘুনাথপুর মহকুমা আদালতে তোলা হলে চার মহিলাকে ১৪ দিনের জেল হেফাজতে পাঠানো হয়। এছাড়া পাঁচজনকে পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। পুলিশ হেফাজতে থাকা ধৃতদের নাম কলেশ্বর হেমব্রম,সঞ্জিত মুর্মু,রবীন্দ্রনাথ হেমব্রম, বদিলাল মুর্মু এবং শিবঠাকুর মুর্মু।

প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে জনবহুল এলাকায় প্রকাশ্যে এই বেআইনি নকল মদের কারখানা চলছিল? ঘটনার পর ওই জমিটি স্থানীয় তৃণমূল নেত্রীর স্বামী তথা তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক পূর্ণ চন্দ্র বাউরির, এমন মন্তব্য করে বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা প্রাক্তন সাংসদ দিলীপ ঘোষ বুধবার সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টও করেন। তবে এই বিষয়ে প্রাক্তন বিধায়ক পূর্ণ চন্দ্র বাউরির কোন প্রতিক্রিয়া মেলেনি। যে স্থানে ওই বেআইনি কারখানাটি চলছিল সরবড়ি মৌজার সেই ৩৬১০ নম্বর প্লটের ওই বাড়িটির জমির মালিক কে তা জানতে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তদন্তকারীরা। বাংলার ভূমি ওয়েবসাইট থেকে জানা যাচ্ছে ওই প্লটটি বাইদ শ্রেণির। এর মোট জমির পরিমাণ ২.৩৫ একর। এই প্লটের মধ্যে ৩১৭৫ নং খতিয়ানে সর্বাধিক ১.৪৯ একর জমি রয়েছে সন্তোষী দত্ত (বাউরি)র, যাঁর স্বামীর নামও মিলে যাচ্ছে প্রাক্তন বিধায়কের সঙ্গে।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে কয়েক মাস ধরেই ওই গোডাউনে কাজ শুরু হয়। বাইরে থেকে পুরুষ – মহিলার সেখানে আসা যাওয়া করে। রোজ ছোট – বড় গাড়ি আসে। মাল পত্র ওঠা নামা হয়। তবে বেশিরভাগ কাজ হয় রাতে। এলাকার মানুষজন প্রশ্ন তুলেছেন, ঘটনাস্থল থেকে মাত্র দুশো মিটার দূরে অবস্থিত আবগারি কার্যালয়। তাহলে তাদের নজর এড়িয়ে কীভাবে এই বেআইনি কারবার চলছিল? তাহলে সত্যিই কি চক্রের পেছনে রয়েছে কোনো প্রভাবশালীর হাত?

Post Comment