শুভদীপ মাহাত ও সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:
চুয়াড় বিদ্রোহের মহানায়ক বীর শহীদ রঘুনাথ মাহাতর জন্মবার্ষিকী উদযাপনের মঞ্চ থেকেই জঙ্গলমহলের রাজনীতিতে লেখা হলো এক নয়া সমীকরণ। শনিবার একদিকে যখন আদিবাসী কুড়মি সমাজের ‘সেঁউরন’ (স্মরণ) কর্মসূচি থেকে সরাসরি পদ্ম শিবিরে ভোট দেওয়ার ডাক দিলেন খোদ ‘মূল মানতা’, অন্যদিকে ঠিক তখনই ঝালদার তুলিনে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মেগা জনসভা কাঁপালেন ঝাড়খণ্ডের ডুমরির জনপ্রিয় বিধায়ক তথা জেএলকেএম সুপ্রিমো টাইগার জয়রাম কুমার মাহাত।
আদিবাসী কুড়মি সমাজ এতদিন ‘নো ভোট টু তৃণমূল’ স্লোগানেই নিজেদের আটকে রেখেছিল। কিন্তু এদিন নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান একেবারে স্পষ্ট করে মূল মানতা (প্রধান উপদেষ্টা) অজিতপ্রসাদ মাহাত জানিয়ে দিলেন, তাঁরা এবার সরাসরি বিজেপিকে ভোট দেওয়ার জন্যই ময়দানে প্রচার চালাবেন। এই রাজনৈতিক পালাবদলের কারণ হিসেবে তিনি খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আস্থার কথা তুলে ধরেন। মূল মানতা বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আমাদের দাবিদাওয়া পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন। তাই আমরা জনজাতিদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার কথাই বলব। খুব শীঘ্রই আমাদের রাজ্য কমিটির বৈঠক হবে, যেখানে অমিত শাহের প্রতিনিধিও উপস্থিত থাকবেন”। পাশাপাশি রাজ্যের শাসকদলের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি জানান, তাঁদের দাবি নিয়ে তৃণমূল কিছুই করেনি, আর সেই বঞ্চনার কথা মাথায় রেখেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
রাজনৈতিক এই ডামাডোলের মাঝেই এদিন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে জয়পুর বিধানসভা কেন্দ্রের গেরুয়া প্রার্থীর রূপরেখাও। মূল মানতার ছেলে বিশ্বজিৎ মাহাত এবার সরাসরি পদ্ম প্রতীকে লড়াইয়ের ময়দানে। বিজেপির প্রথম প্রার্থী তালিকায় তাঁর নামের পাশে ‘সমর্থিত প্রার্থী’ লেখা থাকার মূল কারণ ছিল তাঁর অরাজনৈতিক পদটি। কিন্তু পদ্ম-প্রতীক হাতে তুলে নেওয়ার আগে বিশ্বজিৎ ইতিমধ্যেই আদিবাসী কুড়মি সমাজের জেলা যুব সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। আর ছেলের এই রাজনৈতিক লড়াইয়ের পথ প্রশস্ত করতে মূল মানতা এদিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “প্রয়োজনে আমি নিজে ছেলের হয়ে প্রচারে নামব”।
শনিবার নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরেই আদিবাসী কুড়মি সমাজের এই ঐতিহাসিক ‘সেঁউরন’ কর্মসূচি পালিত হয়। একটি সুসজ্জিত মিছিল শেষে পুরুলিয়া শহরের নর্থ লেক রোডে সাহেব বাঁধের উল্টোদিকে গরাম থানে বীর শহীদ রঘুনাথ মাহাতকে স্মরণ করা হয়। জঙ্গলমহলের বাতাসে তখন ভাসছিল ঐতিহ্যবাহী ঝুমুরের সুর আর রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিত।

অন্যদিকে, এই একই দিনে জঙ্গলমহলের রাজনৈতিক পারদ চড়িয়েছেন জেএলকেএম সুপ্রিমো টাইগার জয়রাম মাহাত। শনিবার শহীদ রঘুনাথ মাহাতর জন্মদিন উপলক্ষে ঝালদার তুলিনের উহুপিঁড়ি ময়দানে তাঁর মেগা জনসভা ছিল। প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও এই সভায় মানুষের উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। বৃহত্তর ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনের ডাক দিয়ে এবং জঙ্গলমহলের ভূমিপুত্রদের অধিকার ছিনিয়ে আনার লক্ষ্যেই যে তাঁর দল এপার বাংলার ভোটে লড়ছে, তা এদিন স্পষ্ট করে দেন টাইগার। আবেগঘন সুরে তিনি বলেন, “এই পুরুলিয়া জেলা আর আমাদের বোকারো বা ধানবাদ আলাদা কিছু নয়। সবই সেই সাবেক মানভূম জেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ হয়তো দুটো রাজ্যের সীমারেখা আলাদা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় আজও এক”। জঙ্গলমহলের এই আসনগুলিতে দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে আজ, রবিবার বোকারোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে চলেছে ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চা।









Post Comment