insta logo
Loading ...
×

মমতার বিরুদ্ধে মামলা করুক সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতিকে চিঠি সাংসদের

মমতার বিরুদ্ধে মামলা করুক সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতিকে চিঠি সাংসদের

সুজয় দত্ত, পুরুলিয়া :

চাকরি হারা শিক্ষকদের নিয়ে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের বিরোধিতা করে দেশের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দিলেন পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদ।
সুপ্রিম কোর্ট মমতার বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করুক, প্রধান বিচারপতিকে লেখা চিঠিতে এমনই আবেদন করেছেন সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো।

সোমবার নেতাজি ইন্ডোরের এই সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ”আমি চাকরিহারা শিক্ষকদের পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখছিলাম। এখনও সুপ্রিম কোর্ট যোগ্য ও অযোগ্য বলতে পারেনি। চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা নেই। চাকরি কেড়ে নেবেন না। মুখ ও মুখোশের তফাৎ বুঝতে হবে।” তিনি আরও বলেন, ”২০২৪ সালে নির্বাচনের সময় দুর্গাপুরে মিছিল করছিলাম। সুপ্রিম কোর্টে আমরা আপিল করেছিলাম, হাই কোর্টের রায়টাকে স্থগিতাদেশ দিতে। বিচারপতি চন্দ্রচূড় তা করে দেন। আরেকজন প্রধান বিচারপতি এলেন। যোগ্য, অযোগ্য না দেখে প্যানেল বাতিল করে দিলেন! এই রায়ের পিছনে কোনও খেলা নেই তো?” যতদিন না নতুন নিয়োগ সম্পন্ন হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত চাকরিহারা ‘যোগ্য’ শিক্ষকরা কাজ করুক, এই আবেদন নিয়ে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ।

মুখ্যমন্ত্রীর এসব মন্তব্যের পরই দেশের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নাকে দেওয়া চিঠিতে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি) নিয়োগ মামলায় ঐতিহাসিক এবং সাহসী রায়ের জন্য তিনি সুপ্রিম কোর্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছেন সেই রায় ২০ লক্ষেরও বেশি প্রার্থীকে ন্যায়বিচার এনে দিয়েছে।

তারপরই চিঠিতে তোপ দেগেছেন সাংসদ। সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে চলেছে রাজ্য সরকারের, নেতাজি ইন্ডোর থেকে সে কথা সোমবার জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিছু প্রশ্নও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। সাংসদ অভিযোগ করেন, সেইসব মন্তব্য ও প্রশ্নে ভারতের বিচারব্যবস্থাকেই অপমান করা হয়েছে। পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদের আবেদন, বিচারব্যবস্থা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এইসব মন্তব্যের জন্য স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করা হোক।

রায় দানের দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংবাদিক সম্মেলন প্রসঙ্গ উত্থাপন করে চিঠিতে সাংসদ লেখেন,

“…যা ঘটেছে তা গভীরভাবে বিরক্তিকর এবং উদ্বেগজনক। যার শাসনে এই কেলেঙ্কারিটি সংঘটিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের সেই মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শীর্ষ আদালতের রায়কে সমর্থন করার পরিবর্তে, মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিচার বিভাগের সমালোচনা করার সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে সিনিয়র আইএএস কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই ভাষণে বিচার বিভাগ এমনকি সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তা সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থাকে নাড়া দিয়েছে।

৭ এপ্রিল, যখন শ্রীমতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখ্য সচিব মনোজ পন্ত এবং শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর সাথে কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে সরকার-আয়োজিত একটি সভায় সভাপতিত্ব করেন, তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের সাথে সংহতি প্রকাশের আড়ালে এই অনুষ্ঠানটি সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশ্য নিন্দা এবং প্রধান বিচারপতিকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার একটি মঞ্চে পরিণত হয়।

বক্তাদের মধ্যে ছিলেন একজন সুপরিচিত লেখক আবুল বাশার। তিনি বিচার বিভাগ এবং প্রধান বিচারপতির অফিস সম্পর্কে মর্মান্তিক এবং অসম্মানজনক মন্তব্য করেছিলেন। মিডিয়া সাক্ষাৎকারে আবুল বাশার স্বীকার করেছেন যে তিনি রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু কর্তৃক আমন্ত্রিত ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থাকা অবস্থায় রাজ্য সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনে এই ধরনের কাজ ঘটতে পারে, তা বিচার বিভাগের মর্যাদার প্রতি চরম অবমাননা।

এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যখনই আদালত তৃণমূল সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, তখনই এর নেতারা এমনকি ক্যাডাররাও বিচারকদের উপর মৌখিক ও শারীরিক আক্রমণের আশ্রয় নিয়েছে, বিশেষ করে কলকাতা হাইকোর্ট থেকে। বিচার বিভাগকে ভয় দেখানোর এই প্রচেষ্টা সম্পর্কে মাননীয় আদালত ভালোভাবেই অবগত।

প্রকৃতপক্ষে, বিচার বিভাগীয় কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ন করার ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধরণ এখন স্পষ্ট। সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে বর্তমান এসএসসি কেলেঙ্কারি পর্যন্ত পদ্ধতিগুলি ভয়ঙ্করভাবে একই রকম:

১) দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা ব্যবহার করে জনসাধারণের অর্থ লুঠ করা;

২)রাষ্ট্রীয় যন্ত্রপাতি এবং কোষাগারের তহবিল ব্যবহার করে শীর্ষ আইনজীবীদের নিয়োগ করা এবং ন্যায়বিচার বিলম্বিত করা;

৩)ফল প্রকাশিত হলে বিচার বিভাগের উপর আক্রমণ:

৪)বিরোধী দলগুলিকে দোষারোপ করে আইনি তদন্তকে রাজনৈতিকীকরণ করা।

মাননীয় প্রধান বিচারপতি, এটি এখন কেবল একটি রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি ভারতের সংবিধানের ভিত্তিকে আঘাত হানার জন্য হুমকি। যদি একজন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এবং তার সরকার বারবার এবং প্রকাশ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করতে পারেন, তাহলে এটি বিচার বিভাগীয় অরাজকতার বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করবে। এমন নজির আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।”

সাংসদ সুপ্রিম কোর্টকে বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করেছেন।

১) সাংবিধানিক কর্মকর্তাদের বিচার বিভাগের উপর এই বারবার আক্রমণের বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিবেচনা করুন।

২) এই বৃহৎ কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্তদের রক্ষা করার জন্য রাজ্যের কোষাগারের সম্পদ এবং তহবিলের ব্যবহারের তদন্ত হোক।

৩) যারা রাজনৈতিক ক্ষমতার আশ্রয়ে আদালতকে অসম্মান করেছে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।

এর আগে শিক্ষা ব্যবস্থার বেসরকারিকরণের চক্রান্ত চলছে বাংলায়, এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি দিয়েছিলেন সাংসদ। এবার এই ইস্যুতেই চিঠি দিলেন দেশের প্রধান বিচারপতিকে। এর প্রতিক্রিয়া কী হয় সে দিকেই দৃষ্টি সংশ্লিষ্ট মহলগুলির।

Post Comment