insta logo
Loading ...
×

আর্তই প্রভুজি’ মন্ত্রে মহাশিবরাত্রিতে মাসান হোলিতে মাতলো পুরুলিয়া

আর্তই প্রভুজি’ মন্ত্রে মহাশিবরাত্রিতে মাসান হোলিতে মাতলো পুরুলিয়া

শিব পার্বতীর বিয়েতে বরযাত্রী ভক্তরা

সুইটি চন্দ্র , পুরুলিয়া:

মহাশিবরাত্রিতে পুরুলিয়া জুড়ে তৈরি হল ভক্তি, সংস্কৃতি ও মানবসেবার এক অনন্য মেলবন্ধন। শহরের বিভিন্ন শিবমন্দিরে সকাল থেকেই ভক্তদের ঢল নামলেও এ বছর বিশেষভাবে নজর কেড়েছে মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে ধর্মীয় উৎসবের সমন্বয়ে আয়োজিত শিবের বরযাত্রা ও শিব-পার্বতীর বিবাহ অনুষ্ঠান। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সমাজসেবার বার্তা তুলে ধরার মধ্য দিয়ে উৎসবটি পেয়েছে এক নতুন মাত্রা।

পুরুলিয়া শহরের গাড়িখানা এলাকায় অবস্থিত ‘আপনা ঘর’ আশ্রমের উদ্যোগে আয়োজিত শিবের বরযাত্রা এ বছর বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। আশ্রম কর্তৃপক্ষের দাবি, ধর্মীয় উৎসবকে সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত করাই তাদের লক্ষ্য। অসহায় ও পথবাসী মানুষদের উদ্ধার করে আশ্রমে আশ্রয় দেওয়া ও সুস্থ করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কাজ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে তারা।
২০১৮ সালের মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠিত এই আশ্রমে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৬০০ জনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩০০ জনকে সুস্থ করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আশ্রমের সদস্যদের ভাষায়, এখানকার আবাসিকরা “প্রভুজি”—তাদের সেবা করাই শিবসেবার সমান।
বিশেষ আকর্ষণ ছিল অঘরি থিমের তাণ্ডব নৃত্য। শম্ভুর ত্রিনয়ন থেকে আগুন বেরোনোর প্রতীকী উপস্থাপনা, ছাই-ভস্মের আবহ এবং শক্তির প্রকাশে দর্শকরা মুগ্ধ হন। রানাঘাট থেকে আগত কেয়ানা চৌধুরি মা কালী সেজে তাণ্ডব নৃত্যে মাতিয়ে দেন উপস্থিত ভক্তদের। অন্যদিকে হাওড়ার শুভ দাসের নেতৃত্বে ১২ জনের দল অঘরি নৃত্যের মাধ্যমে শিবতাণ্ডবের আবহ তৈরি করে। শুভ দাস জানান, “আমাদের নাচের থিম ছিল অঘরি সাধকদের উপস্থাপনা। শিব, পার্বতী ও মা কালী—তিন শক্তির মিলন দেখানোর চেষ্টা করেছি। পুরুলিয়ার মানুষের ভালোবাসা পেয়ে আমরা আপ্লুত।”
বরযাত্রা শেষে আশ্রম প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শিব-পার্বতীর প্রতীকী বিবাহ। শিব ও পার্বতীর ভূমিকায় ছিলেন ভোলা গুপ্তা ও নিশা দেবী। তাদের সাজ ও অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়। শিবের বেশধারী ভোলা গুপ্তা বলেন, “শিবের সাজে অংশ নেওয়া এক আলাদা অনুভূতি। মানুষের ভালোবাসা সত্যিই অভিভূত করেছে।”
বিবাহ অনুষ্ঠান শেষে প্রসাদ বিতরণকে কেন্দ্র করে আশ্রমে ভক্তদের ঢল নামে। প্রসাদ গ্রহণে সামিল হন শহরবাসীর পাশাপাশি আশ্রমের আবাসিকরাও, যা উৎসবের আনন্দকে আরও গভীর করে তোলে।
অন্যদিকে,অযোধ্যা পাহাড়তলির লহরিয়া শিব মন্দিরে মহাশিবরাত্রি উপলক্ষে সকাল থেকেই ছিল উপচে পড়া ভিড়। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ঝাড়খণ্ড থেকে বহু ভক্ত পুজো দিতে আসেন। শিব-পার্বতীর বিবাহের পুণ্যতিথি উপলক্ষে মন্দির চত্বরে তৈরি হয় ভক্তিমুখর পরিবেশ। ভক্তদের সুবিধার্থে মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে নেওয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থা—বয়স্ক ও অসুস্থদের জন্য রাখা হয় আলাদা সহায়তা কেন্দ্র। সোমবার পর্যন্ত চলবে পুজো ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার। একই ছবি দেখা যায় ঝালদার বেনা বাঁধ শিবমন্দিরসহ জেলার নানা শিবালয়ে।
শিব পুরাণ মতে, ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে পালিত হয় মহাশিবরাত্রি, এই রাতেই সম্পন্ন হয় শিব ও পার্বতীর বিবাহ। সেই বিশ্বাসে ভক্তরা শিবলিঙ্গে গঙ্গাজল, দুধ, বেলপাতা ও ফুল নিবেদন করে অন্ধকার ও অজ্ঞতা দূর করার প্রার্থনা জানান।

এবারের মহাশিবরাত্রি পুরুলিয়ায় শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; মানবসেবা, সংস্কৃতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তা তুলে ধরে উৎসবটি পেয়েছে আলাদা মাত্রা। শিবের বরযাত্রা যেন হয়ে উঠেছিল ভক্তি ও মানবতার এক যৌথ উদযাপন।

Post Comment