
সুশান্ত চন্দ
অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ-
কাশিপুর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়
যোগাযোগ -৮৬১৭৫৪৯৩৭৩
ই-মেইল – susantachand590@gmail.com
ভারতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য রত্ন হিসাবে মহাকুম্ভ মেলা শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি মানব জীবন, মহাবিশ্ব এবং আধ্যাত্মিকতার সম্পর্কের একটি গভীর জ্ঞানদর্শনের প্রতিফলন। প্রতি ১২ বছরে একবার আয়োজিত এই মেলা শুধু মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনা ও বিশ্বাসের একটি মহাসম্মেলন নয়। বরং ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল এবং বিজ্ঞানী গবেষণার একটি অসাধারণ মিশ্রণও।

প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা ও যোগীরা মহাবিশ্বের শক্তির সাথে মানবজীবনের সম্পর্কের উপর গভীর মননশীলতা এবং জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। মহাকুম্ভ মেলা, বিশেষ করে যে সময়ে এটি অনুষ্ঠিত হয়, তা মহাকাশের বিশেষ ঘটনার সাথে সম্পর্কিত। যেমন বৃহস্পতি এবং শনির কক্ষপথের বিরল অবস্থান। এই বৈজ্ঞানিক সাদৃশ্য পৃথিবী এবং মানুষের মধ্যে এক আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপন করতে সহায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়। মহাকুম্ভ মেলা সেই সময়ে অনুষ্ঠিত হয় যখন বৃহস্পতি মকর রাশিতে প্রবেশ করে। যা ঐতিহাসিকভাবে আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতার সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়।

বৃহস্পতি রাতের আকাশে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। (ছবি: স্টেলারিয়াম)
বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, এই সময়ে নদীর জল পবিত্র এবং জীবাণুমুক্ত হতে পারে, কারণ সূর্য এবং চন্দ্রের অবস্থানের কারণে পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের কিছু পরিবর্তন ঘটতে পারে। এই পরিবর্তনগুলি মানুষের শরীরের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যা শারীরিক এবং মানসিক শান্তি আনতে সহায়ক। তাই কেবল আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতার জন্য নয়। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্যও মহাকুম্ভ মেলার স্নান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অবশ্য, মহাকুম্ভ মেলা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি ভারতের প্রাচীন বৈজ্ঞানিক দর্শন এবং মহাবিশ্বের শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত এক অমূল্য শিক্ষা। মহাকুম্ভ মেলার স্থানগুলি, প্রায়শই নদী সঙ্গমস্থল, প্রাচীন ভারতের ভূগোল ও ভূ-চৌম্বকীয় শক্তির প্রতি গভীর উপলব্ধি প্রকাশ করে। বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে এই স্থানগুলিতে শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় শক্তির ক্ষেত্রগুলি আধ্যাত্মিক উন্নতি ও শারীরিক সুস্থতার জন্য সহায়ক।
মহাকুম্ভ মেলার এই মহাসম্মেলন কেবল আধ্যাত্মিকতার প্রতি মানুষের বিশ্বাসের জোড় নয়, এটি বৈজ্ঞানিক ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করে। প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের শক্তি ও মানব জীবনের সম্পর্ককে অনুধাবন করে যে ধরনের আচার-অনুষ্ঠান তৈরি করেছিলেন, তা আজও আমাদের আধুনিক বিজ্ঞান ও গবেষণার সামনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করে।

মহাকুম্ভ মেলা পৃথিবী, মহাবিশ্ব এবং মানব জীবনের মধ্যে এক গভীর সংযোগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি আমাদের শিখিয়ে দেয় যে আধ্যাত্মিকতা এবং বিজ্ঞান একে অপরের পরিপূরক। এবং মানব সভ্যতার সর্বোচ্চ লক্ষ্য, মুক্তি, অর্জনে এদের মেলবন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে, যখন প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান আরও বিকশিত হবেl আমাদের উচিত এই প্রাচীন জ্ঞান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পৃথিবী এবং মহাবিশ্বের সঙ্গে আরও সুষম এবং সংহত সম্পর্ক স্থাপন করা। মহাকুম্ভ মেলা, এই বিশাল আধ্যাত্মিক সমাবেশ, আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে আধ্যাত্মিকতা এবং বিজ্ঞান একে অপরকে সমর্থন করে, এবং মানব জীবনের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই সংযোগ রক্ষা করা।
(লেখকের মতামত নিজস্ব )
Post Comment