insta logo
Loading ...
×

হারিয়ে যাচ্ছে কাঁথা! কারণ কী ?

হারিয়ে যাচ্ছে কাঁথা! কারণ কী ?

দেবীলাল মাহাত, আড়শা:

প্রবাদে ‘ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখা’ই হোক আর কবি জসিমউদ্দীনের সেই রুপাই সাজুর অমর প্রেম কাহিনি ‘নকশি কাঁথার মাঠ’ ‌, সাহিত্যে বারংবার উঁকি দেওয়া কাঁথা এখন বিস্মৃতির গর্ভে তলিয়ে যেতে চলেছে।আধুনিকতার সঙ্গে অসম লড়াই তাকে ঠেলে দিয়েছে প্রাচীন তকমা দিয়ে।

একসময় গ্রামের মহিলাদের গ্রীষ্মের অলস দুপুর কিংবা বর্ষায় বাড়িতে বসে থাকার একঘেয়েমি কেটে যেত কাঁথা সেলাইয়ের রূপকথায়। কবি জসীমউদ্দীনের কবিতায় মেয়ে সাজুর তৈরি নকশি কাঁথার মতো নিজেদের হাতে তৈরি কাঁথার ওপরে সুতোর কাজে সুন্দর সুন্দর ছবি ফুটিয়ে তুলতেন মহিলারা। সে দিন আর নেই। বর্তমানে বাড়িতে বাড়িতে কাঁথা ব্যবহারের চলটাও ধীরে ধীরে যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আধুনিক মেশিন,বাহারি পশমের কম্বল, হালকা লেপ, কাঁথাকে যেন কোণঠাসা করে দিয়েছে। আধুনিকতার যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে আদিম লোককলা কাঁথা শিল্প।

কাঁথা শিল্পের ব্যবহার বহু প্রাচীন।নিজেদের প্রয়োজন বোধ থেকেই কাঁথার জন্ম। মূলত বাড়ির মহিলারাই কাঁথা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। গ্রামের দিকে বিছানার জন্য শীতে লেপ কিংবা কম্বলের ব্যবহার খুব বেশি না থাকায় কাঁথাই ছিল ভরসা। বাড়ির অব্যবহৃত পুরানো শাড়ি ,জামা দিয়ে তৈরি করা হতো কাঁথা। পারিবারিক প্রয়োজন ছাড়াও, মেয়ের বিয়েতে, বাড়িতে সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে, উপহার স্বরূপ কাঁথা দেওয়া রীতি ছিল। অভিজ্ঞতা ও কল্পনাকে আশ্রয় করে বাড়ির মেয়ে , মহিলারা তৈরি করতো কাঁথা। আর কাঁথার উপরে থাকতো ছুঁচ ও সুতোয় বোনা পশু, পাখি, ফুল ফলের ছবি। পুরনো কাপড়ের উপর তৈরি করা হতো অসাধারণ সব শিল্প কর্ম।

তবে সময়ের সাথে সাথে সুন্দর এই শিল্প কর্মটি হারিয়েই যেতে বসেছে। গ্রামে গ্রামে এসেছে কাঁথা তৈরির সেলাই মেশিন। কম সময়ের মধ্যেই দ্রুত তৈরি হয়ে যাচ্ছে এক একটি কাঁথা। নবীন প্রজন্মও বিমুখ কাঁথা সেলাই থেকে। ফলে বাড়িতে বাড়িতে কমে আসছে কাঁথা সেলাইয়ের প্রচলন। লোকশিল্পের এই ধারাটি ক্রমে সরে যাচ্ছে গহন অন্ধকারে। আড়শা ব্লকের বামুনডিহা গ্রামের ভাগ্য মাহাত, বালিকা মাহাত জানান, “প্রথমে যখন শ্বশুর বাড়িতে আসি, তখন দেখতাম শাশুড়ি, ঠাকুরমা গ্রীষ্মের ভরা দুপুরে বাড়িতে বসে একমনে কাঁথা সেলাই করতো। সময় পেলেই কাঁথা বোনার চেষ্টা করি। সময়ও কাটে। কাঁথাও তৈরি হয়।” কুদাগাড়া গ্রামের এক কাঁথা সেলাই মিস্ত্রি ভাদরি কুমার জানান, “বিভিন্ন গ্রাম থেকে পুরানো কাপড় নিয়ে এসে মেশিনের সাহায্যে কাঁথা সেলাই করি। একটি কাঁথা তৈরি করতে ছয়-সাতটি কাপড় লাগে। প্রতিদিন ৪-৫টি কাঁথা সেলাই করে থাকি। গ্রামের অনেক লোক এই কাঁথা সেলাইয়ের সাথে যুক্ত রয়েছে।”

কাশিপুর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক ডঃ ক্ষীরোদ চন্দ্র মাহাত জানান “এক সময় গ্রাম বাংলায় কাঁথা তৈরির ঐতিহ্য ছিল। কাঁথা শিল্প ছিল গ্রামীন মহিলাদের হস্ত শিল্পের নমুনা। আধুনিকতার যুগে শিল্পটি হারিয়ে যেতে বসেছে। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বর্তমান প্রজন্মের মহিলারাও।”

Post Comment