বিশ্বজিৎ সিং সর্দার, গোপলাডি (পুরুলিয়া ):
হুটার বাজিয়ে আসছে অ্যাম্বুলেন্স। ভাড়া ৩৯ হাজার টাকা। সেই প্রয়াগরাজ থেকে পুরুলিয়ার টামনা থানার গোপলাডি। সঙ্গে ৬ পুণ্যার্থী। না ভুল হলো ৬ পুণ্যার্থীর ৩ জন শায়িতা চির নিদ্রায়। মহাকুম্ভ স্নান করা হলো না এ জন্মে আর। পথেই একটি অজ্ঞাত পরিচয় লরি তাদের পিষে দিয়ে চলে যায়। শাশুড়ি কুন্তী মাহাতো (৬৫), বৌমা আলপনা মাহাতো (৪৪) ও তাঁদের প্রতিবেশী জাগরী মাহাতো (৪৫) উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজের বেনারস-কানপুর ১৯ নম্বর জাতীয় সড়কে নিষ্প্রাণ দেহ হয়ে পড়ে থাকলেন।

শুধু পুরুলিয়া নয়, সারা ভারত জুড়ে সমস্ত সংবাদ মাধ্যমে কুম্ভ যাত্রার পথে মঙ্গলবার ভোরের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সংবাদ। শুধু সেখানে যা নেই তা হলো যোগী রাজ্যের চূড়ান্ত অব্যবস্থার ফলেই যে এই দুর্ঘটনা, তার হদিশ। সরকারের পক্ষ থেকে কোনওরকম সাহায্যের আশ্বাস কেউ দেয়নি। এমনকি গাঁটের কড়ি খরচ করে আম্বুলেন্সে দেহগুলো বাড়ি আনার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। মুঠোফোন মারফত জানালেন চাকলতোড় মোড় থেকে মহাকুম্ভ স্নান করাতে ৬০ পুণ্যার্থীকে নিয়ে যাওয়া ট্যুর অপারেটর বিষ্ণু গোপ। তিনি বলেন, “ওখানকার লোকাল থানার ওসি কেবল ৫হাজার টাকা দিয়েছেন।

অ্যাম্বুলেন্সে আমি আছি। আছেন মৃতা জাগরী মাহাতোর স্বামী কৃষ্ণ কিশোর মাহাতো আর মৃতা কুন্তী মাহাতোর পুত্র তথা মৃতা আলপনা মাহাতোর স্বামী বাবুলাল মাহাতো। একটি বাস এবং দুটি বোলেরোতে ৬০ জনকে নিয়ে এসেছিলাম। এঁদের পরিবারের অন্যদের একটি বোলেরোতে সকালেই বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা বিকেল চারটায় হাসপাতাল থেকে দেহগুলি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছি। যানজট না থাকলে সকালে পৌঁছে যাব আশা করছি। ” মঙ্গলবার রাত্রি ১১টা ১৫ নাগাদ বিহারের ওপর দিয়ে ছুটছে অ্যাম্বুলেন্স। বিষ্ণু বাবু আরও জানান, বাস ও বোলেরো ওখানেই রইল। বাকিরা মহাকুম্ভে স্নান করেছেন। বাকি ট্যুর করে গাড়িগুলো ফিরবে।

এদিকে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জেরে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে হত দরিদ্র পরিবারগুলির ওপর। গোপলাডি গ্রামের বাসিন্দা ৭৫ বছরের চিনিবাস মাহাতো কানে কম শোনেন। ফলে হই হট্টগোলের কিছুই বুঝতে পারছেন না তিনি। তাঁকে জানানো হয়নি যে তাঁর স্ত্রী কুন্তী আর বড়ো বউমা আলপনা মহাযাত্রায়।
পেশায় গাড়ির চালক কুন্তি দেবীর ছেলে বাবুলাল মাহাতো কান্নাভেজা গলায় টেলিফোনেই জানালেন, ” মা ও স্ত্রীর মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। বাবাকে যে কীভাবে সামলাব, বুঝতে পারছি না! “

টেলারিং ও চাষাবাদের কাজ করে সংসার চালান গোপলাডির কৃষ্ণ কিশোর মাহাতো। সঞ্চয়ের টাকায় স্ত্রী জাগরী মাহাতোকে নিয়ে পুণ্য স্নান করতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু স্ত্রীকে নিয়ে আর বাড়ি ফিরতে পারলেন না।দুপুরের পর থেকেই কান্নার রোল গোপলাডি গ্রামে। মাকে হারিয়ে স্তব্ধবাক জাগরী মাহাতোর বড় ছেলে তপন ও ছোট ছেলে মৃত্যুঞ্জয়। কোন কথা বলছে না তাদের বোন অঞ্জনাও। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলো জনপ্রতি ৩ হাজার টাকার টিকিটে খাওয়া,থাকা, যাওয়া-আসার কড়ারে টুর অপারেটরের সঙ্গে রওনা দিয়েছিলেন মহাকুম্ভের উদ্দেশে। এত বড়ো বিপদ নামবে মাথার ওপর কেউই বুঝতে পারেননি। বাবুলাল মাহাতো বলছেন,” মুহূর্তে সব ওলোটপালট হয়ে গেল। “










Post Comment