নিজস্ব প্রতিনিধি, সাঁওতালডি :
পড়ন্ত বিকেলের রোদ তখন সাঁওতালডি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের গায়ে এসে পড়ছে। কিন্তু কন্ট্রাকটার শ্রমিক ইউনিয়নের সভামঞ্চের উত্তাপ তখন রীতিমতো চরমে। উপস্থিত হাজারো শ্রমিকের সামনে মাইক হাতে দাঁড়িয়ে তখন একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ শানিয়ে চলেছেন পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সহ-সভাধিপতি তথা দাপুটে তৃণমূল নেতা সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়। খোদ পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্পোরেশন লিমিটেড -এর আধিকারিকদের বিরুদ্ধে তাঁর এই প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দেখেই বোঝা গেল, এই শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান ও ঠিকাদারি নিয়ে ক্ষোভের আগুন ঠিক কতটা গভীরে।
এদিন সভার শুরু থেকেই সুজয়বাবুর নিশানায় ছিল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিয়োগ নীতি এবং কর্পোরেট তোষণ। স্থানীয় যুবকদের কাজের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলে সভামঞ্চ থেকে রীতিমতো গর্জে ওঠেন তিনি। অফিসারদের কড়া বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “আমার এই এলাকার স্বার্থে জলাঞ্জলি দিয়ে কর্পোরেট তোষণ চিন্তা-ভাবনা তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে আর যারাই করুক, আমরা তো করবই না। সামান্যতম যেটা কাজ, সেই এলাকার মানুষকে বাদ দিয়ে বাইরের থেকে যদি লোক ঢুকানো হয়, তাহলে কিন্তু আমরা কর্পোরেটকে একেবারে ধরাসায়ী করে দেব”।
শুধু কর্মসংস্থানই নয়, এদিন তাঁর নজরে ছিল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরের ঠিকাদারি ব্যবস্থা। স্থানীয় ছোট ঠিকাদারদের বঞ্চিত করে বাইরের বড় ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার পেছনে অফিসারদের একাংশের দিকে সরাসরি দুর্নীতির আঙুল তোলেন এই তৃণমূল নেতা। উপস্থিত শ্রমিকদের প্রবল হাততালির মাঝেই তাঁর দ্বিতীয় জোরালো বক্তব্যটি ছিল, “বাইরে থেকে বড় বড় ঠিকাদার এনে, ক্লাব করে ঠিকাদারি দেওয়া হচ্ছে! কাজ হচ্ছে একটাই, কম্পিটিশনটা যাতে না হয় এবং কর্পোরেটের যে সমস্ত অফিসাররা আছে তাদের ভাগটা যেন ঠিক থাকে। এটাই হচ্ছে এদের চিন্তাভাবনা। এগুলো সব আমরা বুঝি, আমরা না বোঝার কেউ নই”।
কর্পোরেট আধিকারিকদের পাশাপাশি এদিন সুজয়বাবুর তোপ থেকে রেহাই পাননি এলাকার সাংসদও। এলাকার বেহাল রাস্তাঘাট এবং সিএসআর ফান্ডের সঠিক ব্যবহার না হওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করার পাশাপাশি, ন্যূনতম আলোকসজ্জার অভাব নিয়ে তিনি সরাসরি সাংসদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। চরম কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ দপ্তরে যোগাযোগ করে একটা হাইমাস্ট লাইট পর্যন্ত জ্বালাতে পারেননি, আপনি এমন একটা এমপি! অপদার্থ! কোনো কাজ এলাকায় করেন না! শুধু বড় বড় কথা বললে কাজ হবে না, এলাকার মানুষের সাথে কাজ করুন”।
সভার একেবারে শেষলগ্নে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কারখানার এই ‘ফাঁকফোকর’ বন্ধ করতে এবং পেরিনিয়াল ও আনপেরিনিয়াল শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে খুব শীঘ্রই প্রতিনিধি দল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসবে। তাতে কাজ না হলে কলকাতা গিয়ে খোদ বিদ্যুৎমন্ত্রীর দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়ে রাখেন তিনি।
উপস্থিত শ্রমিকদের আসন্ন ইদ ও আগামী ২৭শে মার্চের রামনবমীর অগ্রিম শুভেচ্ছা জানিয়ে যখন তিনি মঞ্চ ছাড়ছেন, তখন সাঁওতালডির বাতাসে স্পষ্ট ভাসছে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আগামী দিনে কোনো বড়সড় আন্দোলনের ইঙ্গিত।











Post Comment