
দেবীলাল মাহাতো
স্টেট এডেড কলেজ টিচার্স,
কাশিপুর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় ।
ই-মেইল- debilalmahato61@gmail.com
যোগাযোগ :৮৯৭২২৮৯০০৪
দুর্গাপুজো শেষ হতেই গ্রামবাংলায় শুরু হল ‘বাঁদনা’ পরবের প্রস্তুতি। সেই প্রস্তুতি চলে কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথি আগের দিন পর্যন্ত। তারপর কালিপুজার দিন থেকে শুরু হয়’ বাঁদনা’ পরবের সূচনা। যা চলে তিন দিন ধরে । শেষ হয় ভ্রাতৃ দ্বিতীয়ার দিন। আবার কোথাও কোথাও ৫ দিন। মূলত গো বন্দনা হিসাবেই এই পরব বেশি পরিচিত। ‘বন্দনা ‘ থেকে’ বাঁদনা ‘শব্দটির উৎপত্তি। আবার কেউ কেউ মনে করেন ‘বাঁধন’ বা ‘বন্ধন’ শব্দ থেকেও হতে পারে। এই উৎসবকে আদিবাসী মানুষজন ‘সহরায়’ পরব হিসাবে পালন করেন। এই পরব শুরু হয় কালীপুজোর দিন থেকে। চলে মকর সংক্রান্তির আগে পর্যন্ত।
মূলত গ্রামের প্রধানরা সিদ্ধান্ত নেন এই ‘সহরায়’ উৎসব তাদের গ্রামে কবে পালন হবে।
পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম সহ ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের কৃষিজীবি মানুষের অন্যতম প্রানের উৎসব ‘বাঁদনা’। কুড়মি সহ আদিবাসী সমাজের কৃষিভিত্তিক উৎসব। আমন ধান বাড়িতে তোলার আগে গরু, গাভীদের বন্দনা করার রীতি। এই পরবের প্রস্তুতি শুরু হয় বিজয়া দশমীর পর থেকেই । যা চলে একপক্ষ কাল পর্যন্ত। এই সময় থাকে কৃষিজীবি মানুষের চরম ব্যস্ততা। গোয়াল ঘর সহ সমস্ত ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে , মাটির প্রলেপ, রং দিয়ে সাজিয়ে তোলেন মহিলারা। সাজিয়ে তোলা হয় পুরো গ্রামকে। অমাবস্যার আগের দু’ দিন গরু, গাভীদের পেট ভরে খাওয়ানো হয় ঘাস। স্নান করিয়ে শিং,খুর ও মাথায় তেল, সিঁদুর দেন
কৃষিজীবি মানুষ। বাঁদনার পাঁচ দিন – তেল দেওয়া, ঘাওয়া, অমাবস্যা, গরয়াপূজা , গরু খুঁটা নামে পরিচিত।
অমাবস্যার দিন হয় ‘গোঠপূজা’। করা হয় ‘ছাদনদড়ি’ ও ‘বাঁধনদড়ির’ পুজাও। বিকালে গ্রামের এক প্রান্তে গরু গুলো একত্র করা হয়। সেখানে আলপনা এঁকে, তার মধ্যে রাখা হয় ডিম। এর পর ঢোল, ধামসা বাজিয়ে গরুগুলিকে উত্তেজিত করা হয় । যে গরু ডিমটা ভাঙ্গবে , সেই গরুর মালিককে গামছা, লুঙ্গি ,ধুতি দিতে হয় গ্রামের লায়াকে। সন্ধ্যার দিকে বাড়ির দরজা, তুলসিতলা সহ বিভিন্ন জায়গায় শাল, কাঁঠাল গাছের পাতায় চালের গুড়ি রেখে , সলতে দিয়ে জ্বালানো হয় প্রদীপ। এই রীতিকে বলা হয় ‘কাচিজিয়ারি”। গ্রামের শেষ স্থানে পাট কাঠি জ্বালিয়ে উপস্থিত হয় গ্রামের ছেলেরাও। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, এই জ্বলন্ত আগুন ডিঙোলে সারাবছর খোস,দাঁদ,চর্ম রোগ থেকে মুক্তি মিলে। যার নাম- ‘ইজোর-পিজোর’ খেলা। রাতে গ্রামের মানুষ ঢোল, ধামসা সহ লোকবাদ্য নিয়ে সবার বাড়িতে যান। অহিরা গীত গেয়ে গরু, গাভীদের জাগিয়ে রাখেন। যারা অহিরা গীত গেয়ে গরু গাভী দের জাগিয়ে রাখেন তাদেরকে বলা হয়’ ধিং ধাং ‘। অহিরা গীত গুলো লোকসংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। গ্রামবাংলার মানুষের বিশ্বাস , অমাবস্যার রাতে মর্ত্যলোকের প্রতিটি গোয়াল বাড়িতে আসেন স্বয়ং শিব। এসে দেখেন , গো গাভীরা কেমন আছেন। সেই জন্য সারারাত গোয়াল ঘরে জ্বালানো হয় ঘিয়ের প্রদীপ।
অমাবস্যার পরের দিন প্রতিপদে ‘গরয়া পুজা’। ভোরবেলা হয় ‘দাঁদুড় খেদা’ নাচ। সংসারে ব্যবহৃত পুরানো ঝুঁড়ি, কুলো, টোকিয়া গ্রামের শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেন মহিলারা । কোথায় কোথায় আগুন জ্বালিয়ে দেয় । তারা বিশ্বাস করেন, এতে গ্রামের অমঙ্গল দূর হয়। কৃষকরা লাঙ্গল, জোয়াল, মই চাষের যন্ত্রাংশ পরিষ্কার করে তুলসী তলায় রাখেন। জমি থেকে আনা ধানের শিষ দিয়ে গয়না তৈরী করে গরুর শিং এ পরিয়ে দেন। মহিলারা বাড়ির উঠোনে আলপনা আঁকেন। দুপুর বেলা গোয়াল ঘরে শালুক পাতার ওপর মাটির শিবলিঙ্গ রেখে পুজা করেন কৃষকরা। পুজার নৈবেদ্য হিসাবে বানানো হয় ‘গরয়া পিঠা’। অনেকে মোরগ বলি দেন।
পঞ্চমদিন অর্থাৎ শেষদিন ‘গরু খুঁটা ‘। দুদিন ধরে গরুকে সেবাযত্ন করে উৎসবের শেষ দিনে বিকাল বেলায় গ্রামের ফাঁকা মাঠে ও কুলিতে সবল গরু গুলোকে বিভিন্ন রং এ সাজিয়ে একটি শক্ত খুঁটিতে বাধা হয়। তারপর সামনে মরা পশুর চামড়া ঘুরিয়ে তাকে উত্তেজিত করে তোলে গ্রামবাসীরা। সেই সঙ্গে চলে ঢোল,ধামসা সহযোগে অহিরা গীত পরিবেশন। আসলে গবাদি পশুদের কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য এই উৎসব নিবেদিত করে থাকে কৃষিজীবি মানুষ। কারন কৃষিভিত্তিক সভ্যতায় , গবাদি পশুদের অবদান অপরিহার্য। গৃহস্থ্যের শ্রীবৃদ্ধির জন্য তারাও সারাবছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে থাকে।সেই জন্য বাঁদনা পরবে আমন ধান বাড়িতে তোলার আগে কৃষি সহায়ক যন্ত্রপাতি সহ গরু, গাভীদের বন্দনা করে থাকেন কৃষিজীবি মানুষ। তাদের দিয়ে কোনো কাজ করা হয় না। দেওয়া হয় বিশ্রাম।বিশ্বায়নের যুগে নাগরিক সংস্কৃতি , গ্রামীণ সংস্কৃতিকে থাবা বসালেও আজও কৃষিজীবী মানুষ ধরে রেখেছে তাদের ঐতিহ্য, তাদের সংস্কৃতি।
(লেখকের মতামত নিজস্ব )













Post Comment