সুজয় দত্ত ও বিশ্বজিৎ সিং সর্দার, রাহামদা (বান্দোয়ান)
চেহারায় যেন সলমান খান আর আওয়াজে যেন সানি দেওল। জিনাতের জন্য বড়দিনের যে ব্যুফে সাজিয়ে দিল বন দফতর, তার খরচ আঠেরো হাজার টাকা। বড়দিনেও টোপ হিসেবে কালো ছাগলই রাখল বন দফতর। তবে এবার আর কচি পাঁঠা নয়, একেবারে হৃষ্টপুষ্ট দশাসই তিনটি ছাগল রাখা হলো ফাঁদের কাছে টোপ হিসেবে৷ রাহামদার ছাগলই যখন বাঘিনীর ভালো লেগেছে, তখন রাহামদা থেকেই তিনটি ছাগল কিনে নিল বন দফতর। একেকটির দাম ৬ হাজার টাকা। তাদের ডাকে গমগম করছে রাইকা পাহাড় ও ভাঁড়ারি বা ঝাঁড়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী জঙ্গল। বাঘিনীর গলায় বাঁধা রেডিও কলার বলছে এখানেই আছে সে।

চারদিন হয়ে গেল বাঘিনী জিনাত এসেছে পুরুলিয়ার বান্দোয়ানে। চারদিন হয়ে গেল জঙ্গলে যেতে পারেনি পাহাড়তলির গ্রামগুলির মানুষজন। জঙ্গল তাদের আয় উপায়। কেউ সংগ্রহ করেন শুকনো কাঠ, কেউ তোলেন পাতা। কিন্তু বাঘ বন্দিতে বনদফতরের নানান প্রচেষ্টা বিফল হওয়ায় তীব্র সংকট তাদের জীবনে। পেটে পড়েছে টান। ঘরে থাকলে খিদেতে মরতে হবে, জঙ্গলে গেলে বাঘের ভয়।

এবার বন দফতর না পারলে নিজেরাই বাঘ খেদাবেন। বলছেন রাহামদার বাসিন্দা কমল টুডু। তিনি বলছেন জঙ্গলের ওপর ভরসা করেই দিন গুজরান করেন তারা। এভাবে ঘরবন্দি হয়ে থাকলে খিদেয় মরতে হবে। বাড়ির ছাগল চরতে পাঠিয়েছিলেন। দুটি নিরুদ্দেশ। আর দুটির গলায় বাঘের কামড়। জখম গুরুতর। গোটা রাহামদার খান পনেরো ছাগল নিরুদ্দেশ। বলছেন কমল টুডু।

তৃতীয় দিনে বাঘিনীর অবস্থান ছিল রাইকার ঝাঁড়া পাহাড়ের জঙ্গল। সেখানে সে প্রথম ৫টি ছাগল শিকার করে। আর তারপরই রাইকা সংলগ্ন গ্রামগুলিতে আতঙ্কের ছায়া। বুধবার চতুর্থ দিনেও বাঘিনী অধরা। এদিনও ঠিক একই রকম ভাবে বান্দোয়ান ১ বনাঞ্চল কার্যালয়ের অতিথি আবাসে সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ দলের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নিয়ে তৈরি হয় নতুন রণকৌশল। বৈঠক চলে সকাল থেকে দুপুর অবধি। বিকেলবেলা বাঘিনীর শেষ লোকেশন পাওয়া গেছে। সে আছে রাইকার ভাঁড়ারি বা ঝাঁড়া পাহাড়েই। তাই পাহাড়ের পাদদেশে বাঘিনীকে বন্দি করতে জন্য খাঁচা পাতা হয়েছে। আগে ছিল তিনটি খাঁচা। সুন্দরবন থেকে আরও দুটি খাঁচা বাড়িয়ে খাঁচার সংখ্যা এখন পাঁচটি।

টোপ পুরুলিয়ার নধর ছাগল। বিকেল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত খাঁচা লাগানোর কাজ চলে। সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের উচ্চপদস্থ আধিকারিক এবং বনদফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের উপস্থিতিতে খাঁচা বসানো হয়।

দক্ষিণ পশ্চিম চক্রর মুখ্য বনপাল বিদ্যুৎ সরকার বলেন, ” আজ রাত অবধি খাঁচা দিয়ে বাঘিনীকে বন্দি করার পরিকল্পনাই রয়েছে। কাল নতুন পরিকল্পনার কথা জানানো হবে।

ওড়িশার সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্পের বাঘিনী জিনাত দেড়মাস ঘর ছাড়া। ওড়িশা থেকে বাংলা, ঝাড়খণ্ড হয়ে তার ঘাঁটি বাংলার সীমান্তবর্তী পুরুলিয়া জেলার বান্দোয়ান। তাকে কি আবার ঘরে ফিরিয়ে দিয়ে এলাকাকে আতঙ্কমুক্ত করতে পারবে বন দফতর? কতদিনে? পেটে টান পড়া বাসিন্দাদের মনে প্রশ্ন এখন এটাই।





Post Comment