নিজস্ব প্রতিনিধি, সাঁওতালডিহি:
বিধানসভা নির্বাচনের আগে সংগঠনের ভিতরের ক্ষত প্রকাশ্যে চলে এল পুরুলিয়ার সাঁওতালডিহি শিল্পাঞ্চলে। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রীতিমতো রক্তক্ষয়ী রূপ নিল পাড়া ব্লকের সিংবস্তি এলাকায়। দলেরই যুব নেতৃত্বের অনুগামীদের হামলায় আক্রান্ত হলেন ব্লক স্তরের মহিলা নেত্রী-সহ একাধিক কর্মী।
সোমবার সন্ধ্যায় সাঁওতালডিহি শিল্পাঞ্চলের সিংবস্তি এলাকায় তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষে রীতিমতো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে নামাতে হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী।
ঘটনার জেরে গ্রেফতার হলেন ৮ জন, যার মধ্যে ৩ জন মহিলা ও ৫জন পুরুষ।
তারা সিং বস্তি, কাঁকি বস্তি, কাঁকি বাজার ও শ্রীরামপুর এলাকার বাসিন্দা। মঙ্গলবার ধৃতদের রঘুনাথপুর মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাদের ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। ঘটনার জেরে শাসক শিবিরে অস্বস্তি এতটাই বেড়েছে যে আক্রান্ত মহিলা নেত্রীর বাড়িতে ছুটে যান জেলা নেতৃত্ব। পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি নিবেদিতা মাহাতো, তৃণমূল ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের জেলা সভাপতি উজ্জ্বল কুমার সহ একাধিক নেতা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। রাজ্য তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক ও পাড়া বিধানসভার কো-অর্ডিনেটর সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,
“আইন মেনে পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তৃণমূলের পাড়া ব্লক যুব সভাপতি অমর বাউরি ও ব্লক মহিলা নেত্রী সন্তোষী সিং—এই দুই শিবিরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতবিরোধ চলছিল। সেই দ্বন্দ্বই সোমবার দুপুরে হিংসাত্মক রূপ নেয়।
অভিযোগ, দুপুরে স্বপন বাউরির নেতৃত্বে একদল যুবক ধারালো অস্ত্র নিয়ে সিং বস্তি এলাকায় ঢুকে অশান্তি শুরু করে। সেই সময় কিরন সিং নামে এক যুবককে বেধড়ক মারধর করা হয় এবং তার হাত ভেঙে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। ঘটনার পর সাঁওতালডিহি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। কিন্তু অভিযোগ দায়ের করাতেই পরিস্থিতি শান্ত না হয়ে আরও ভয়াবহ আকার নেয় বলে দাবি আক্রান্তদের। সন্ধ্যায় ফের ওই এলাকায় ফিরে এসে অভিযুক্তরা গালিগালাজ, ভাঙচুর ও মারধর চালায় বলে অভিযোগ। ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক যুবককে বেধড়ক মারধর করা হয়।
সন্তোষী সিং-র অভিযোগ, তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে গেলে যুব নেতার ভাই বিবেক বাউরি হকি স্টিক দিয়ে তার হাতে আঘাত করে, যার ফলে তার হাত ভেঙে যায়। ঘটনার খবর পেয়ে বিশাল পুলিশ বাহিনী এলাকায় পৌঁছায়।
আক্রান্ত নেত্রীর আরও দাবি, পুলিশ আসার সময় অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ার আগে ভয়ঙ্কর হুমকি দিয়ে যায়—”এই ঘটনায় যদি স্বপন বাউরি পদ হারায়, তাহলে এলাকায় লাশ পড়বে।”
যদিও এই ঘটনায় অভিযুক্ত তৃণমূলের পাড়া ব্লক যুব সভাপতি স্বপন বাউরির পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সাঁওতালডিহি থানার পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, ভোটের আগে এই ধরনের গোষ্ঠী সংঘর্ষ শাসক দলের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বিরোধীদের প্রশ্ন—
“যে দল নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষ সামলাতে পারছে না, তারা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেবে কীভাবে?”
ভোট যত এগোচ্ছে, ততই জঙ্গলমহলে শাসকদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।











Post Comment