অ্যাম্বুল্যান্স বিপত্তিতে পরিযায়ী শ্রমিকের দেহ ফেরাতে ত্রাতা পুরুলিয়া পুলিশ, পরিবারকে অভিষেকের আশ্বাস
নিজস্ব প্রতিনিধি, বরাবাজার ও পুরুলিয়া:
পুরুলিয়ার বরাবাজারের পরিযায়ী শ্রমিক সুখেন মাহাতো খুনের ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করেছে পুনে গ্রামীণ পুলিশ। ধৃত আমিন শওকত শেখকে বৃহস্পতিবারই ললিকন্ঠ থানার পুলিশ আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। পরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে বাংলায় কথা বলার কারণেই ওই শ্রমিককে খুন করা হয়েছে, এমন কোনও প্রমাণ এখনও মেলেনি বলে জানিয়েছেন পুনে গ্রামীণ পুলিশের সুপার সন্দীপ গিল।
পুলিশ সূত্রের দাবি, গত ৯ ফেব্রুয়ারি কাজে যাননি বরাবাজারের তুমড়াশোলের বাঁধডি গ্রামের বাসিন্দা সুখেন। তদন্তে উঠে এসেছে, ওই দিন তিনি কোথাও বসে মদ্যপান করছিলেন। একটি তিন মিনিট সাত সেকেন্ডের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেছে পুলিশ। সেখানে দেখা যায়, একটি জায়গায় এসে তিন যুবকের কাছে দাঁড়ান সুখেন। দু’জন মোবাইলে কিছু দেখছিলেন। সুখেন তা দেখতে ঝুঁকে পড়তেই এক যুবক বিস্ময় প্রকাশ করেন। পরে কথাকাটাকাটির জেরে এক যুবক তাঁকে ধাক্কা দিতে শুরু করেন। এরপর দু’জনই ক্যামেরার ফ্রেমের বাইরে চলে যান।

তবে ওই ফুটেজ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পুরুলিয়া জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান শান্তিরাম মাহাতো। তাঁর দাবি, ‘‘এই ফুটেজ দিয়ে প্রমাণ করা যায় না যে মদের আসরে খুন হয়েছে। গোটা ঘটনাই ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’’
নিহতের দাদা তুলসিরাম মাহাতো জানান, ৯ ফেব্রুয়ারি বিকেল তিনটে নাগাদ বাড়ি থেকে কাজে বেরিয়েছিলেন সুখেন। সন্ধ্যায় একই কর্মস্থলে গিয়েও ভাইকে দেখতে পাননি তিনি। বারবার ফোন করলেও সাড়া মেলেনি। পরদিন সকালে খোঁজাখুঁজির মাঝেই পুলিশ ফোন করে জানায়, একটি হোটেলের পিছনে দেহ পড়ে রয়েছে। পরে গিয়ে দেহ শনাক্ত করেন তিনি। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানান তুলসিরাম। শিকরাপুর থানার পুলিশ তাঁকে জানিয়েছে, পারলৌকিক ক্রিয়া শেষ হলে তদন্তের স্বার্থে পুনেতে যেতে হবে।
এদিকে মৃতদেহ ফেরানো নিয়েও ভোগান্তিতে পড়ে পরিবার। বুধবার রাতে ৭০ হাজার টাকায় ভাড়া করা অ্যাম্বুল্যান্সে পুনে থেকে রওনা দেয় দেহ। কিন্তু ছত্তিশগড়ের মাহাতম জেলার পিথোড়ায় গাড়ি বিকল হয়ে যায়। পরে পুরুলিয়া জেলা পুলিশের উদ্যোগে অন্য অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করা হয়। জেলা পুলিশের সহায়তায় শুক্রবার দুপুরে গ্রামে পৌঁছয় সুখেনের দেহ। তুলসিরামের কথায়, ‘‘হাতে টাকা ছিল না। কীভাবে ভাড়া দেব বুঝতে পারছিলাম না। পুলিশ সাহায্য না করলে বিপদে পড়তাম।’’

ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। শুক্রবার হেলিকপ্টারে করে নিহতের বাড়িতে পৌঁছান তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবারের সঙ্গে দেখা করে তিনি ন্যায়বিচারের দাবিতে দলমত নির্বিশেষে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, মহারাষ্ট্র পুলিশ তদন্তে ব্যর্থ হলে মামলা বাংলার হাতে তুলে দেওয়া হোক, রাজ্য ৫০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেবে। প্রয়োজনে দলের প্রতিনিধি দল মহারাষ্ট্রে পাঠানোর কথাও জানান তিনি। নিহতের দুই ভাইকে রাজ্যে চাকরির ব্যবস্থা করার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করবেন বলেও জানান অভিষেক।
তিনি আরও বলেন, দোষীদের জামিন যাতে না হয়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে মহারাষ্ট্র সরকারকে। প্রয়োজন হলে হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আইনি লড়াই চালাবে দল। এদিন প্রায় আধ ঘণ্টা নিহতের বাড়িতে থেকে মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানান তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী সন্ধ্যারানি টুডু-সহ তৃণমূলের একাধিক নেতা ও বিধায়ক।
অন্যদিকে অভিষেকের বক্তব্যের পাল্টা তোপ দেগেছেন পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। তাঁর দাবি, ‘‘বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য খুন, এ কথা ঠিক নয়। ভোটের আগে বিভাজনের রাজনীতি করা হচ্ছে। কেন রাজ্যের হাতে তদন্তভার তুলে দেবে মহারাষ্ট্র? বিজেপি শাসিত রাজ্যে তদন্ত সঠিক সময়েই শেষ হয়।’’











Post Comment