insta logo
Loading ...
×

অযোধ্যা থেকে অযোধ্যা ট্রেন! সাংসদের বয়ানে নতুন বিতর্ক

অযোধ্যা থেকে অযোধ্যা ট্রেন! সাংসদের বয়ানে নতুন বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া :

পুরুলিয়ার ‘অযোধ্যা টু রাম জন্মভূমি অযোধ্যা’ ট্রেন চলাচলের এই স্বপ্নের কথাই সাংবাদিক সম্মেলনে তুলে ধরলেন পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। বৃহস্পতিবার সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁর কথায়, বহুদিনের দাবি ছিল পুরুলিয়া থেকে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় সরাসরি রেল-সংযোগের। অবশেষে সেই দাবি মেনেই পুরুলিয়া থেকে আনন্দবিহার পর্যন্ত (ভায়া অযোধ্যা, বারাণসী, লখনউ) নতুন ট্রেনের অনুমোদন দিয়েছে রেল মন্ত্রক।

সাংসদের দাবি, ২৬ জুলাই ২০২১-এ প্রথম চিঠি দেন তিনি। পরে ২৫ জুলাই ২০২৪-এ দ্বিতীয়বার চিঠি ও সাক্ষাৎ। একাধিকবার তদ্বিরের পর অবশেষে সবুজ সঙ্কেত। তাঁর বক্তব্যে ধন্যবাদ ধ্বনিত হয়েছে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-র প্রতি।

শুধু নতুন ট্রেনই নয়। সাংবাদিক বৈঠকে তিনি জানান, বারবেন্দা–ডামরুঘুটু দ্বিতীয় লাইন, বারবেন্দা–বোকারো স্টিল সিটি তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন—সবকিছুরই অনুমোদন মিলেছে। ২৮-০৮-২০২৫ তারিখে মন্ত্রিসভায় পাশ হওয়া জামশেদপুর–আসানসোল তৃতীয় লাইন (ভায়া পুরুলিয়া) দ্রুত শুরু হবে বলেও দাবি তাঁর। চাণ্ডিল–মুরি (ভায়া ইলু) প্রকল্পের ফাইনাল লোকেশন জমা পড়েছে। ইলু–সিলি বাইপাসে টেন্ডার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন। পুরুলিয়া–ঝাড়গ্রাম লাইনের সার্ভে শেষ, রেলবোর্ডের নোটিফিকেশনের অপেক্ষা। আর ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানী এক্সপ্রেসের পুরুলিয়া স্টেশনে স্টপেজ—এই ঘোষণায় বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছে সাংসদের কণ্ঠে।

তবে ‘অযোধ্যা থেকে অযোধ্যা’ প্রসঙ্গ উঠতেই সামনে আসে আর এক দীর্ঘ বিতর্ক।

পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের সঙ্গে রামায়ণের যোগ রয়েছে—এ কথা বহুবার বলেছেন সাংসদ মাহাতো। পাহাড়ের গড়ধামের কাছে ছোট জলাধার, স্থানীয়দের ভাষায় সীতাকুণ্ড। অখিল ভারতীয় বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের আওতায় পূর্বাঞ্চল কল্যাণ আশ্রমের রামমন্দিরে দেওয়াল জুড়ে রামায়ণের ছবি। জনশ্রুতি—রাম-সীতা বনবাসে এখানে এসেছিলেন। কেউ বলেন আড়াই দিন, কেউ বলেন ২৭ দিন।

২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন পর্যটনমন্ত্রী প্রহ্লাদ সিং প্যাটেল-কে চিঠি দিয়ে এই লোককথার ভিত্তিতে অযোধ্যা পাহাড়কে পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরার আর্জিও জানিয়েছিলেন সাংসদ। তাঁর হিন্দি চিঠিতে উল্লেখ ছিল—বনবাসের সময় সীতার তৃষ্ণা মেটাতে রাম ভূমিতে তীর নিক্ষেপ করে জল বার করেন; সেই স্থানই আজকের সীতাকুণ্ড।

যদিও রাজ্যের পর্যটন প্রচারপত্রে সীতাকুণ্ডকে নৃতত্ত্বের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ‘অটো ফ্লো’ ভূতাত্ত্বিক আকর্ষণ হিসেবেই বেশি তুলে ধরা হয়।

গবেষকদের একাংশের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, হিমালয় সৃষ্টিরও আগে এই অঞ্চলে যাযাবর বীরহোড় জনজাতির বাস ছিল। পরে ভূমিজ, সাঁওতালদের আগমন। আদিবাসী সংস্কৃতিতে মূর্তিপূজার বিরোধিতা রয়েছে। ফলে রাম-সীতার কাহিনির সঙ্গে প্রাচীন জনজাতি সংস্কৃতির মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। সাঁওতালি ভাষায় ‘আয়োদিয়া’ শব্দের অর্থ—অতিথিশালার মতো আশ্রয়দাত্রী মা। আবার কারও মতে, অযোধ্যা সিং নামে এক ভূমিজ জমিদারের নাম থেকেই পাহাড়ের নামকরণ।

পুরুলিয়া শহরের রামায়ণ পাঠকদের বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। রামচরিতমানস-এ কিংবা রামায়ণ-এর সুন্দরকাণ্ডে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের উল্লেখ মেলে না।

বিতর্ক থাকলেও আবেগে ভাটা নেই। প্রতিদিন সীতাকুণ্ডে ভিড় জমান পর্যটকেরা। স্থানীয় গাইডদের মুখে শোনা যায় বনবাসের কাহিনি। হিলটপের বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ী অপূর্ব মুখোপাধ্যায় বলেন, সীতার তৃষ্ণা নিবারণে রামের পাতালভেদী বাণে উৎসারিত জল আজও অবিরাম। স্থানীয়দের কাছে তা পবিত্র। সেই জলই নাকি মিশেছে আপার ড্যামে। অনেকে একে পাহাড়ি বুড়বুড়ি দাঁড়ি বলেন।

এই আবেগকেই রাজনৈতিক সেতুতে বাঁধতে চান সাংসদ। তাঁর কথায়, পুরুলিয়ার অযোধ্যা আর উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা—দুই অযোধ্যাকে এক সূত্রে বাঁধার উদ্যোগ এই ট্রেন।

তবে বাস্তব বলছে অন্য কথা। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে কোনও রেললাইন নেই। যে পুরুলিয়া স্টেশন থেকে ভায়া অযোধ্যা আনন্দবিহারগামী ট্রেন চলবে, সেই স্টেশন পাহাড় থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে। ফলে ‘অযোধ্যা থেকে অযোধ্যা’ আপাতত রাজনৈতিক ভাষ্যেই সীমাবদ্ধ—রেলপথে নয়, প্রতীকে।

Post Comment