insta logo
Loading ...
×

আতঙ্কের আঁধার থেকে আতসবাজির আলোয় অযোধ্যা গড়ল ম্যারাথন ইতিহাস

আতঙ্কের আঁধার থেকে আতসবাজির আলোয় অযোধ্যা গড়ল ম্যারাথন ইতিহাস

বিশ্বজিৎ সিং সর্দার, অযোধ্যা পাহাড় :

ইতিহাসের পর ইতিহাস। যাঁদের ‘লক্ষ্য’ প্রকল্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০২৫ ব্যাংকক এশিয়া কাপে তীরন্দাজিতে সোনা জিতে ইতিহাস গড়ল পুরুলিয়ার মেয়ে বাসন্তী মাহাতো, সেই পুরুলিয়া জেলা পুলিশের উদ্যোগেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বাংলার বুকে প্রথম নাইট ম্যারাথনের সাক্ষী থাকল রূপসী বাংলা অযোধ্যা পাহাড়। থুড়ি পাহাড়, জঙ্গল, রাত আর রাত দখলের ম্যারাথনে বদলে যাওয়া অযোধ্যা পাহাড়।

কে না সামিল ছিলেন ১৪ কিমির এই ম্যারাথনে?দৌড়লেন স্বয়ং এডিজি ( পশ্চিমাঞ্চল ) অশোককুমার প্রসাদ, এডিজি (এসটিএফ) বিনীত গোয়েল। হাজির ছিলেন আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট সুনীল চৌধুরি তিনজনেই কোন না কোন সময় ছিলেন পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার। দৌড়ালেন আইজি (বাঁকুড়া) সিসরাম ঝাঝোরিয়া সহ জঙ্গলমহলের জেলাগুলির পুলিশ সুপাররা।

জেনারেল ও মহিলা ক্যাটাগরি মিলিয়ে পাহাড়ি পথে দৌড়ালেন জঙ্গলমহল সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ও কলকাতা মিলিয়ে এক হাজারের বেশি প্রতিযোগী। শনিবার সাধারণ তরুণ-তরুণী থেকে অ্যাথলিট সবাই সামিল ম্যারাথনের মাধ্যমে অযোধ্যা পাহাড়ে এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের কাহিনী শোনাতে।

রাজ্যের অন্যতম তাবড় পুলিশ কর্তা বিনীত গোয়েলের হাত দিয়ে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে এই ম্যারাথনের সূচনা। ছিলো চোখ ধাঁধানো আতসবাজি। সবেমিলে প্রমাণ হয়ে গেল আতঙ্ক থেকে আতসবাজিতে কতটা পালটে গেছে অযোধ্যা।

সন্ধ্যা থেকে প্রায় মধ্যরাত। আক্ষরিক অর্থেই ম্যারাথন জ্বর। পুরুলিয়া জেলা পুলিশের টিম ওয়ার্ক করল অসাধ্য সাধন। সঙ্গে অযোধ্যা পাহাড়ের পর্যটন সংস্থা থেকে আদিবাসী- মূলবাসির মানুষজনের সাদর সহযোগ। আধুনিকতার সঙ্গে মিশে গেল ইতিহাস। ধরতি আবা ভগবান বিরসা মুন্ডাকে স্মরণ করে এক ঐতিহাসিক পরম্পরাকে স্মরণ করল নাইট ম্যারাথন। এই আয়োজনে মূল সঞ্চালকের সঙ্গে ছিলেন পুরুলিয়ার ভূমিপুত্র শিবরাম কিসকু ও বিকাশ মাহাতো।

বদলে যাওয়া অযোধ্যা পাহাড়কে দুচোখ ভরে দেখল বাংলা। যে টিম ওয়ার্ক রাজ্যে যে এই প্রথম আয়োজন করল নাইট ম্যারাথন, অযোধ্যা পাহাড়ের বুকে রাতের ঝলমলে আলোয় গাইল দিনবদলের গান, জেলা পুলিশের সেই টিম ওয়ার্কেই আজ থেকে ১৫ বছর আগে অযোধ্যা পাহাড় মাও আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেয়েছিল। এমন রঙিন আলোয় ঝলমল সেই আতঙ্ক মুক্তির জন্যেই তো।

সেই আতঙ্কমুক্তির কথা শোনা গেল জেলার প্রাক্তন পুলিশ সুপারদের কথায়। এডিজি (এসটিএফ) বিনীত গোয়েল বললেন, ” একসময় আমি এখানকার পুলিশ সুপার ছিলাম। মাও দমনে তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ যা পারেনি তা করে দেখিয়েছে রাজ্যের পুলিশ।মাওবাদী দমনে পশ্চিমবঙ্গ মডেল।” আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট সুনীল চৌধুরি বলেন, “একসময় পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার ছিলাম। আগে পুলিশ ছাড়া অযোধ্যা পাহাড়ে কেউ ঢুকতে পারত না।

এই জেলায় মাওবাদী দমনে আমার সঙ্গে পুরুলিয়ার বর্তমান পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায় কাজ করেছেন। আজ অযোধ্যা পাহাড়ের এই বদলে যাওয়া রূপ রাজ্য পুলিশের জন্য। এটাই আমাদের কাছে গৌরবের।”

পুলিশের ম্যারাথনে সর্বাগ্রে ছিলেন এডিজি ( পশ্চিমাঞ্চল ) অশোককুমার প্রসাদ। তিনি বলেন, “এই ম্যারাথনকে প্রতি বছর আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।” শনিবার অযোধ্যা পাহাড়ে নাইট ম্যারাথন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন বিভাগের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রমন্ত্রী সন্ধ্যারানি টুডু, প্রাক্তন বিধায়ক তথা খ্যাতনামা ফুটবলার দীপ্তেন্দু বিশ্বাস, অ্যাথলিট পিঙ্কি প্রামানিকের মতো ক্রীড়াক্ষেত্রের তারকারা।

পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “জঙ্গলমহল সত্যিই যে হাসছে তা আরও একবার প্রমাণ করল এই নাইট ম্যারাথন। ম্যারাথনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আমরা অভিভুত।” নাইট ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন কলকাতার মানিকতলার বাসিন্দা অনুপকুমার চক্রবর্তী, বান্দোয়ানের কেন্দাপাড়ার নেহা প্রামানিক। তাঁদের কথায় ” ম্যারাথন সহ বহু দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। কিন্তু পাহাড়-জঙ্গলের বুক চিরে
এমন নাইট ম্যারাথনের অভিজ্ঞতা কখনোই ভুলবো না। এ এক আলাদা অ্যাডভেঞ্চার ।”

ঝলমলে আলোয় ঢেকে গেছে অযোধ্যার আঁধার । আলো বাড়িয়েছে ক্যাম্প ফায়ারের আলো।পাশেই বাজছে ধামসা-মাদল। পুরুলিয়ার লোকশিল্প ছৌ, নাটুয়া, পাতা নাচ, ঝুমুর আর বাউলের আসরে প্রায় ৪০০ জন লোকশিল্পী।

বাড়তি পাওনা জুম্বা ড্যান্স। ছিল যোগাসন। এমনিতেই পর্যটক ভর্তি অযোধ্যা পাহাড়। তাদের বাড়তি পাওনা হলো জঙ্গলমহল, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের গায়ক গায়িকাদের অনুষ্ঠান। এমন জমকালো ছবি এর আগে দেখেনি অযোধ্যা পাহাড়। বাংলার প্রথম সারির পর্যটন কেন্দ্র গুলোর মধ্যে অন্যতম হওয়ার পরেও।

অযোধ্যার রাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র বছর দশের ধরমবীর মুর্মু ছিল এই নাইট ম্যারাথনের কনিষ্ঠ প্রতিযোগী। ম্যারাথন ফিনিশার হলো সেই। আর দৌড় শেষ করে হাসিমুখে সে জানালো, খুব ভালো লাগছে তার। তার হাসির মধ্যেই যেন ফুটে উঠল হাজার আতসবাজির রোশনাই। তার হাসির মধ্যেই যেন ফুটে উঠল বদলে যাওয়া অযোধ্যা পাহাড়ের নতুন রূপ।

জিতল সবাই। তবুও জিতলেন যাঁরা :

জেনারেল ক্যাটাগরি
প্রথম : বিকাশ প্যাটেল
বাড়ি : মির্জাপুর, উত্তর প্রদেশ
সময় : ৪১ মিনিট ২৮ সেকেন্ড

মহিলা ক্যাটাগরি
প্রথম : শম্পা গায়েন
বাড়ি : মসলন্দপুর উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ
সময় : ৪৪মিনিট ২৩ সেকেন্ড

Post Comment