সুইটি চন্দ্র, বলরামপুর:
দোলের রঙ এখানে শুধু উৎসবের আবহ নয়, আত্মমর্যাদা আর স্বনির্ভরতার প্রতীক। পুরুলিয়ার বলরামপুর ব্লকের ইচাডি গ্রামে এখন আবির মানেই রোজগার, সম্মান আর নতুন পরিচয়ের হাতছানি। আদিবাসী অধ্যুষিত এই ছোট্ট গ্রামটি আজ পরিচিত “আবির গ্রাম” নামে। বাঘমুণ্ডির চড়িদা যেমন মুখোশ গ্রাম নামে জগদ্বিখ্যাত, তেমনই ইচাডিও আবির গ্রাম নামে এমন একটি উদ্যোগ নিয়েছে যা সামনে এসেছে স্থানীয় মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথে দৃঢ় পদক্ষেপ হিসেবে ।
গ্রামের প্রায় ১৩০টি পরিবারের মধ্যে অধিকাংশ পরিবারের মহিলারা যুক্ত হয়েছেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে। ‘ভুরকা ইপিল’ মহিলা স্বনির্ভর দলের হাতেই তৈরি হচ্ছে ভেষজ আবির। পালং শাক, বিট, নিমপাতা ও পলাশের নির্যাস থেকে তৈরি এই প্রাকৃতিক রঙ এখন শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, বৃহত্তর বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদের পুরুলিয়া শাখার তত্ত্বাবধানে আবির তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ঘর, মেশিন ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা হয়েছে। বলরামপুর ব্লক প্রশাসনের নজরদারিতেই চলছে উৎপাদন ও বিপণনের কাজ।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য পিয়ালী টুডু বলেন, “আগে সংসারের ছোটখাটো খরচের জন্যও স্বামীর উপর নির্ভর করতে হতো। এখন নিজের হাতে আবির তৈরি করে বিক্রি করি, নিজের উপার্জন আছে। এই কাজ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। গ্রামের মেয়েরা এখন আর পিছিয়ে নেই।”
পিয়ালীর কথাতেই ধরা পড়ে পরিবর্তনের ছবি। শুধু আর্থিক স্বাবলম্বন নয়, সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রেও বদল এসেছে। নিয়মিত আয়ের ফলে সংসারের খরচে সহায়তা করার পাশাপাশি সন্তানের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন চাহিদা পূরণেও বাড়তি নিশ্চয়তা মিলছে।
দোল-হোলির আগে আবিরের চাহিদা তুঙ্গে ওঠে। ১০০ গ্রাম পলাশের আবিরের দাম ৩৫ টাকা, নিমপাতার ৪৫ টাকা এবং বিট ও পালং শাকের আবির ৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। বিশেষত পলাশের আবিরের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। শীতের আমেজ থাকায় এ বছর পলাশ ফুল কিছুটা দেরিতে ফুটলেও গত বছরের সংগ্রহ করা পলাশের নির্যাস থেকেও আবির প্রস্তুত হয়েছে।
গ্রামের চারপাশে টিলা-ডুংরি, পলাশের লাল আভা আর দেওয়ালচিত্রে সাজানো উপজাতি সংস্কৃতির ছাপ, সব মিলিয়ে পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ইচাডি। দোলের মরশুমে বহু মানুষ এখানে এসে ভেষজ আবির হাতে নিয়ে দেখছেন, কিনছেন এবং গ্রামের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছেন।
উল্লেখ্য, রাজ্যের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ ও বস্ত্র দপ্তরের আওতাধীন পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদ ইচাডিকে “আবির গ্রাম” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পর্যটনের সঙ্গেও যুক্ত করেছে।
গ্রামবাসীদের কথায়, এটি কেবল একটি পণ্য তৈরির উদ্যোগ নয়—এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের গল্প। আবিরের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে ইচাডির ভবিষ্যৎ, আর সেই রঙে মিশে আছে স্বপ্ন, শ্রম আর আত্মনির্ভরতার দৃঢ় প্রত্যয়।










Post Comment