নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:
বিশাল ময়দানে শুধু মাথা আর মাথা। পিসির জনসভাও পরাস্ত ভাইপোর কাছে। জেলা তৃণমূল সূত্রে দাবি, এমন সাজে সভাস্থল আগে কখনও দেখেনি পুরুলিয়া। তিনটি মঞ্চ, বিশাল র্যাম্প, ময়দানের চারপাশ জুড়ে রঙিন হোর্ডিং, সব মিলিয়ে যেন ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চ। হোর্ডিংয়ে বড় অক্ষরে লেখা, ‘আবার জিতবে বাংলা’। কে জিতবে, কে হারবে, সে রায় ভবিষ্যতের হাতে। তবে কাশীপুর বিধানসভার হুড়া ব্লকের লধুড়কা রণসংকল্প সভায় রেকর্ড ভিড় জমেছে, তা নিজেই মেনে নিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। লক্ষ মানুষের জমায়েতের যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল, তা পূরণ হয়েছে বলেই দাবি জেলা নেতৃত্বের।
রবিবারের সভায় অভিষেকের ভাষণ ছিল আক্রমণাত্মক ও হিসাবি। সকাল ১১টা থেকেই মানুষের ঢল নামতে শুরু করে বলে জানান তিনি। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে থাকা মানুষজন আগামী নির্বাচনে পুরুলিয়াকে ফের ‘সবুজে রাঙানোর’ শপথ নিয়েই এসেছেন, এমনটাই দাবি তাঁর। বিশেষ করে মহিলাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
২০১১ সালের পর পুরুলিয়ার উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে অভিষেক বলেন, শান্তি ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি জেলাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য। বাম আমলে বিকেল গড়ালেই শহরে চলাচল কঠিন ছিল, পুলিশের মধ্যেও ছিল ভয়ের পরিবেশ, এমন মন্তব্য করেন তিনি।

ভোটের অঙ্ক টেনে অভিষেক মনে করিয়ে দেন, ২০১৬ সালে ৯টির মধ্যে ৭টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল। ২০১৮ সালে জেলায় সাম্প্রদায়িক অশান্তি ও ২০১৯ সালের প্রভাবের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২১ সালে মাত্র তিনটি আসনে জয় এলেও ২০২৪ সালের ফল বিশ্লেষণ করলে তৃণমূল ৯টির মধ্যে ৬টিতে এগিয়ে। তাঁর দাবি, গোটা রাজ্য আবার সবুজ হওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা।
বিজেপিকে নিশানা করে ট্রাফিক সিগনালের উদাহরণ এনে তিনি বলেন, ‘লাল মানে থামা, গেরুয়া মানে ধীর গতি, সবুজ মানে এগিয়ে চলা।’ বিজেপির জন্যই উন্নয়ন থমকে গেছে বলে অভিযোগ তাঁর। একই সঙ্গে সিপিএম ও বিজেপিকে একসূত্রে বেঁধে বলেন, ‘নতুন বোতলে পুরনো মদ।’
কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আর্থিক বঞ্চনার অভিযোগও তোলেন অভিষেক। ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনা, জল জীবন মিশন, গ্রামীণ সড়ক—সব ক্ষেত্রেই টাকা আটকে দেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। পুরুলিয়ার জল সংকট প্রসঙ্গে জানান, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই লক্ষাধিক পরিবারকে পানীয় জল দিয়েছে, প্রকল্প শেষ হলে আরও বহু পরিবার উপকৃত হবে।
‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার নিয়ে কটাক্ষ করে রেল পরিষেবার বেহাল দশার উদাহরণ দেন অভিষেক। হাওড়া – পুরুলিয়া ট্রেনগুলির অস্বাভাবিক দেরি, পুরুলিয়া ঝাড়গ্রাম রেলপথের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া—সবই তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি কুড়মি সম্প্রদায়কে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার অভিযোগও করেন বিজেপির বিরুদ্ধে। উন্নয়নের খতিয়ান দেখানোর চ্যালেঞ্জ ছোঁড়েন সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোর দিকে।

সভা থেকে বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস ও ফরওয়ার্ড ব্লককে একসঙ্গে আক্রমণ করে তিনি বলেন, এরা সবাই মানুষের অধিকার আটকে রাখতে চায়। এসআইআর প্রসঙ্গ টেনে আত্মঘাতী মৃত্যুর অভিযোগও তোলেন। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধেও সরব হন তিনি।
সরকারি প্রকল্পের খতিয়ান দিতে গিয়ে অভিষেক জানান, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্য সাথি, খাদ্য সাথির সুবিধা পেয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। বিজেপি ক্ষমতায় এলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ হয়ে যাবে, এই আশঙ্কায় হাওয়া দিয়ে তিনি বলেন, তৃণমূল যতদিন ক্ষমতায়, ততদিন এই প্রকল্প চলবে।
ভাষণের শেষে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে অভিষেক বলেন, কোথাও তৃণমূল নেতাদের আচরণে সমস্যা হলে সরাসরি তাঁকে জানাতে। প্রার্থী যেই হোক, ভোটটা আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নের পক্ষেই, এই বার্তাই সভা থেকে তুলে ধরেন তিনি।











Post Comment