সুজয় দত্ত ও বিশ্বজিৎ সিং সর্দার :
প্রায় শুনশান রাস্তা। রাঁচি জামশেদপুর জাতীয় সড়ক ধরে ছুটে চলছে গাড়ি। চাণ্ডিলের বিখ্যাত গোল চক্কর আর বড়োজোর ৫০০ মিটার দূর। আর তখনই গাড়ির হেডলাইট পড়ল তার গায়ে। হলদে কালো ডোরাকাটা শরীর। চমকে উঠে ব্রেক কষতেই সেখান থেকে সরে যায় সে। মঙ্গলবার রাতে রুদিয়া-দড়দা এলাকায় রয়্যাল বেঙ্গল দর্শনের এই জবানবন্দি একমাত্র নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে চান্ডিল বনাঞ্চলের চৌকা থানার বাড়োদার একটি স্কুলের সামনে চলে আসে সে। অন্যদিকে বুধবার রাত ৯ টা নাগাদ চাণ্ডিল রেঞ্জের চাণ্ডিল ব্লকের নারগাডিহি এবং চালকবেড়ার মধ্যবর্তী স্থানে এক ম্যাজিক চালক বাঘটি দেখতে পেয়েছে বলে সূত্রের খবর।
১২ কিমি হেঁটে জিনাতের আশিক বাঘটি মঙ্গলবার ভোরে দলমায় পা রেখেছিল। তারপরে ইউটার্ন? সোজা চাণ্ডিল? বনদপ্তর অবশ্য এগুলো গুজব বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। চান্ডিল রেঞ্জের আধিকারিক শশীরঞ্জন প্রকাশ বলেন, ” ওই গাড়ির চালকের সাথে কথা বলেছিলাম। তিনি বাঘের মত কিছু একটা দেখেছিলেন বলেছেন। আজ বাড়োদা এলাকাতেও গিয়েছিলাম আমরা। সেখানে বাঘের পায়ের ছাপ দেখা যায়নি। তবে বাঘ এই এলাকার বিস্তীর্ণ জঙ্গলেই রয়েছে।”
রয়েছে। কিন্তু কোথায়? ১৯২.২২ বর্গ কিমি বিশাল দলমা অভয়ারণ্য। এই বনভূমির অধিকাংশটাই শ্যাডো জোন। অর্থাৎ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এখানে কাজ করে না। শুধু তাই নয়, এই অঞ্চল ১৫ বছর আগেও ছিল মাওবাদীদের ঘাঁটি। এখন অতিবাম এই সংগঠনটির সক্রিয়তা দেখা না গেলেও তবে তাদের আসা- যাওয়া যে রয়েছে এলাকায়, তা উড়িয়ে দিচ্ছে না ঝাড়খন্ড পুলিশ থেকে গোয়েন্দারা। ফলে ওই রয়্যাল বেঙ্গলকে ট্র্যাক করতে মাও ভয় নিয়ে-ই মঙ্গলবার রাতে দলমা বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্যের উঁচু এলাকা কঙ্কাধশায় স্থায়ী শিবির করে বাঘের সঠিক অবস্থান বোঝার চেষ্টা করছে ঝাড়খন্ড বনবিভাগ।
জিনাতের গলায় যে রেডিও কলার ছিল তাতে তার অবস্থান জানতে পারছিল বনদপ্তর৷ জিনাতের আশিকের গলায় কোন রেডিও কলার নেই। এক সপ্তাহের বেশি হয়ে গেল, একটি বাছুর খেয়েছে সে। শিকার করেছে একটি গরু। এটুকুই জানতে পেরেছে বনদপ্তর। সে খালি পেটে থাকবে না। কিন্তু তার শিকারের নমুনা মিলছে না। ফলে ভরসা কেবল পায়ের ছাপ। মঙ্গলবার সকালে দলমায় প্রবেশের পর সেটুকুও উধাও। দলমা এলিফ্যান্ট প্রজেক্ট ডিভিশন জামশেদপুরের আওতায় থাকা দলমা পশ্চিম রেঞ্জের আধিকারিক দীনেশ চন্দ্র বলেন, “মঙ্গলবার রাত থেকে দলমা অভয়ারণ্যের উঁচু এলাকা কঙ্কাধশায় অস্থায়ী শিবির করা হয়েছে। রাতে তার অবস্থান বোঝার কাজ শুরু করেছি। দিনে লুকিয়ে থাকলেও
রাতেই বাঘ যাতায়াত শুরু করছে।”
অস্থায়ী শিবিরে সরাইকেলা- খরসোঁওয়া, পূর্ব সিংভূমের জামশেদপুর, খুঁটি বনবিভাগ মিলিয়ে প্রায় ৭-৮ জন ডিএফও পদমর্যাদার আধিকারিক, পালামৌ টাইগার রিজার্ভের বাঘ বিশারদরা এবং চিফ ওয়াইল্ড লাইফ ওয়ার্ডেনের তত্ত্বাবধানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের নজরদারি চলছে।
দলমা পশ্চিম রেঞ্জের আধিকারিক অপর্ণা চন্দ্র বলেন, “বাঘ সাধারণত পাহাড় এলাকায় থাকতে চায় না। তারা সমতল এলাকায় থাকে। পাহাড়ে তাদের শিকারে সমস্যা হয়। আমাদের নজরদারি চলছে। “
তাঁর মন্তব্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে পুরুলিয়ার। দলমা থেকে পূর্ব দিকে শুধু পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের দুয়ারসিনি। ওই দলমা অভয়ারণ্য থেকে ডিমনা লেকের পাশ দিয়ে আমদাপাহাড়ি, বান্দোয়ানের
দুয়ারসিনিকে পাশে রেখে ঝাড়খণ্ডের নরসিংহপুর, ডাইনমারি, মাকুলির জঙ্গল হয়ে আমঝরনা থেকে দলমা- কাঁকড়াঝোড় করিডর হয়েছে ঝাড়গ্রামের কাঁকড়াঝোড়েও ঢুকে যেতে পারে আশিক। এই পথ দিয়ে জিনাত এসেছিল বান্দোয়ানের রাইকায়।
বুধবার রাতে নারগাডিহি এবং চালকবেড়ার মধ্যবর্তী স্থানে বাঘ দেখতে পাওয়ার খবরের সত্যতা স্বীকার করেনি বনদপ্তর।
রোজ পুরুলিয়ার কংসাবতী দক্ষিণ ও পুরুলিয়া বনবিভাগ থেকে রিপোর্ট নিচ্ছে অরণ্যভবন। সবে মিলিয়ে জিনাতের টানে ওই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার কখনও সোজা পথে। আবার কখনও ইউটার্ন। এমনকি চরকিপাকও খাচ্ছে বাংলা- ঝাড়খণ্ড সীমানার জঙ্গলে। তাই বাংলা যেমন চিন্তায়। উদ্বেগ ঝাড়খন্ড বনবিভাগও। দলমা পাহাড় রেঞ্জের ১৩৫টি গ্রামে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে ঝাড়খন্ড বনবিভাগ।



Post Comment