insta logo
Loading ...
×

পুরুলিয়ায় দর্শন দিল বাঘিনী জিনাতের ‘ আশিক ‘

পুরুলিয়ায় দর্শন দিল বাঘিনী জিনাতের ‘ আশিক ‘

সুজয় দত্ত ও বিশ্বজিৎ সিং সর্দার :

টানা পাঁচ দিন পুরুলিয়ায় থাকার পর জনসমক্ষে জিনাতের আশিক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার।পুরুলিয়ার বান্দোয়ান ব্লক সদর থেকে মাত্র ৩ কিমি দূরে কেন্দাপাড়া গ্রামের কাছে ভাঁড়ারি সিমসত পাহাড়ের জঙ্গলে দেখা মিলল বাঘের জবুনাগোড়া গ্রামের বাবুশ্বর হেমব্রম স্বচক্ষে দর্শন করেছেন তাকে। টম্যাটো খেত থেকে ফসল তুলতে গিয়েছিলেন তিনি। আর বাঘ নেমেছিল জলাশয়ে জল খেতে। ঠিক তখনই জিনাতের আশিকের দেখা পেলেন তিনি। বাবুশ্বর হেমব্রম বলেন,”আমি সকালের দিকে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়েছিলাম। সেই সময় দেখি কিছুটা দূরে মাটির রাস্তায় জঙ্গলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে বাঘ। সে আমাকে দেখেনি। কিন্তু আমি ওখানে আর একটুও দাঁড়াইনি। গ্রামে এসে মানুষজনকে জানাই। তারপর বনদপ্তরকে খবর দেওয়া হয়।”

এতদিন সে ছিল অশরীরী। আর বৃহস্পতিবার বাঘের দর্শনের খবর হাওয়ার বেগে ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে এলাকায়।

আতঙ্ক হবে না? পুরুলিয়ার বনাঞ্চলে শিকার শুরু করেছে সে। তিনটি গরু মেরেছে সে। পরপর খুবলে খাওয়া তিনটি গবাদি পশুর মৃতদেহ মেলে। যে এলাকায় স্বয়ং রয়্যাল বেঙ্গল দর্শন, তার কিছুটা দূরে ছড়িয়ে ছিল তার ভুক্তাবশেষ। সবে মিলিয়ে একেবারে ভয়ে সিঁটিয়ে বান্দোয়ানের রাইকা পাহাড়, ভাঁড়ারি পাহাড়তলি সহ মাত্র তিন কিমি দূরের সদর বান্দোয়ানও। কেন্দাপাড়া গ্রামের নির্মল পরামানিকেরই তিনটি গরু শিকার করেছে রয়্যাল বেঙ্গল। একটি এখনও নিখোঁজ। বাঘের পায়ের ছাপ খুঁজে খুঁজে সেই গরুর সন্ধানে বাসিন্দারা। নির্মল বাবু বলেন, “গত সোমবার থেকে আমার এই তিনটে গবাদি পশু নিখোঁজ ছিল। বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কী হয়েছে। এভাবে যে বাঘে খেয়ে নেবে তা ভাবতেও পারিনি।”


চরম আতঙ্কে এলাকা। বান্দোয়ানের কেন্দাপাড়া গ্রামের করালী বাস্কে, আহ্লাদি বাস্কে দেখেছেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ভুক্তাবশেষ। আতঙ্কের ছাপ তাদের চোখে মুখে।করালি বাস্কে বলেন, “ভীষণ ভয় লাগছে। রাতের বেলায় আর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে কী করে ঘর থেকে বার হতে পারবো জানি না। বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে যখন বাইরে যাই তখন বাঘের গর্জন শুনেছি।”
রবিবার ভোররাতে জিনাতের প্রেমিক ঝাড়খণ্ডের দলমা থেকে বান্দোয়ানে পৌঁছায়। বনদফতরের অনুমান, সোমবার শিকার করেছে সে। তার কারণ এদিন ওই মৃত গবাদি পশুর কাছ থেকে ভীষণ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। জঙ্গলে যেখানে শিকারের ভুক্তাবশেষ পাওয়া যায় তার পাশেই রয়েছে কেন্দাপাড়া। কেন্দাপাড়ার বাসিন্দা তথা বান্দোয়ান গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান থুলারাম বাস্কে বলেন, “আমি গরু নিয়ে জঙ্গলে যাওয়ার পর ওই মৃতদেহগুলি দেখতে পাই। তারপর গ্রামবাসীদেরকে জানালে বনদফতরে খবর দেওয়া হয়। বন দফতরের লোক এলে আমি ওই জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছিলাম তাদের।”

এই এলাকাতেই অস্থায়ী ডেরা বেঁধেছিলো জিনাত। শিকারের ভুক্তাবশেষ দেখতে সেখানে আসেন সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের বিশেষজ্ঞরাও। বাঘের হামলাতেই ওই তিনটি গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তারা। কংসাবতী দক্ষিণ বনবিভাগের ডিএফও পূরবী মাহাতো বলেন, “যে যুবক বাঘটিকে দেখেছে তার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তাকে আমরা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ছবিও দেখিয়েছি। সে বাঘের যা আকৃতি বলেছে, তা সব মিলে গিয়েছে। ওই এলাকায় বাঘের পায়ের ছাপও দেখা যায়। তবে শিকারটা বাঘেরই কি না সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

গবাদি পশুর মাংসের পচা গন্ধকে টোপ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে বন দফতর৷ এদিন কেন্দাপাড়া লাগোয়া ভাঁড়ারি, জবুনাগোড়া ও রাইকা পাহাড় সংলগ্ন কেশরাতে নতুন করে খানিকটা পঁচে যাওয়া ছাগলের মাংস দিয়ে সবুজ রঙের খাঁচা পাতা হয়েছে। যদি খানিকটা ওই মাংসের ঘ্রাণে সে আসে, সেই অপেক্ষায়
বনবিভাগ। বুধবার মানবাজার দুই বনাঞ্চলের বড়গোড়ায় শূকরের মাংস দেওয়া হয়। কিন্তু আসেনি জিনাতের আশিক। ফলে বৃহস্পতিবার কেন্দাপাড়ার কাছে ভাঁড়ারি সিমসত এলাকায় যেখানে শিকারের ভুক্তাবশেষ পড়ে থাকে তার কিছুটা দূরেই লতাপাতা জড়িয়ে ওই খাঁচা পাতা হয়।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে ওই জবুনাগোড়া সহ রাহামদা, কেন্দাপাড়া, উদলবনি লেদাশলে চলে নাইট ওয়াচিং। কখনও মশাল জ্বালিয়ে। আবার কখনও ক্যামোফ্লেজে নজরদারি চালাচ্ছেন সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের বিশেষজ্ঞরা। ঝাড়গ্রাম থেকে স্মার্ট ক্যামেরা নিয়ে এসে নজরদারি চলছে।

পুনরায় ঘোষণা শুরু করেছে বন দফতর৷ তারা জানিয়ে দেয় আপাতত কোন গবাদি পশু জঙ্গলে না নিয়ে যেতে। সেই সঙ্গে সতর্ক হয়ে সাবধানে চলাফেরা করতে।

রাজ্যের মুখ্য বনপাল ( পশ্চিম চক্র) সিঙ্গরম কুলানডাইভেল বলেন, ” প্রায় ২৫০ মিটার দূর থেকে যমুনাগোড়ার ওই যুবক বাঘ দেখতে পান। আমরা তার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি। ওই বাঘটি একটি পুকুরে জল খায়। ওই এলাকাতেই বাঘটি রয়েছে। “

গত বছরের ২২ ডিসেম্বর পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের রাইকা পাহাড়ের জঙ্গলে ঢুকে পড়ে রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনী জিনাত। ওড়িশার সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্প থেকে ঝাড়খণ্ড, ঝাড়গ্রাম হয়ে পুরুলিয়া আসে সে। ২৯ তারিখ তাকে বাঁকুড়ার রানিবাঁধের গোঁসাইডি এলাকায় ঘুমপাড়ানি গুলি ছুঁড়ে কাবু করা হয়। সেখান থেকে কলকাতা হয়ে ১ জানুয়ারি ওড়িশার সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্পে নিজের বাড়িতে ফিরে যায় জিনাত। আর সেদিনই পুরুলিয়া সীমান্তে ঝাড়খণ্ডের সরাইখেলা-খরসোঁওয়া জেলার চাণ্ডিল শহর সংলগ্ন চৌকা থানার তুল গ্রামের বালিডি জঙ্গলে দেখা মেলে এই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটির। ব্যাঘ্র বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওড়িশা থেকে পুরুলিয়া আসার দীর্ঘ পথে কোথাও এই বাঘটির সঙ্গে দেখা হয়ে থাকতে পারে জিনাতের। আর তার টানেই ঠিক জিনাতের ফেলে আসা পথে চরকিপাক খাচ্ছে তার আশিক।

Post Comment