insta logo
Loading ...
×

মা-সন্তানের অপত্য স্নেহের অনুচ্চারিত গীতবিতান ‘জিতাপরব’

মা-সন্তানের অপত্য স্নেহের অনুচ্চারিত গীতবিতান ‘জিতাপরব’

বিকাশ মাহাত
সহ শিক্ষক, চেক্যা হাই স্কুল, পুরুলিয়া।
ই-মেইল: b.k.mahatoprl@gmail.com
যোগাযোগ:৯৭৩৫১২৪২৭৪

পুরুলিয়া সহ রাঢ়বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পালিত হচ্ছে জিতা পরব।
বাংলায় প্রচলিত লৌকিক উৎসব এর মধ্যে ব্যাপক ভাবে পালিত এবং জনপ্রিয় এক উৎসব হল এই জিতা। পুরুলিয়া জেলা প্রশাসনের পুরুলিয়া জেলা সম্পর্কিত ওয়েবসাইটে জেলার জনপ্রিয় উৎসব বা পরব হিসবেও তাই জিতা র উল্লেখ করা হয়েছে (কোথাও কোথাও জিতিয়া)। উৎসব ও পরব- দুই শব্দের অর্থ বাহ্যিক ভাবে একই মনে হলেও রীতি,রেওয়াজ,বিশ্বাস,পরম্পরা এবং তা পালনের পরিসর হিসেবে কোন কোন পূজা বা অনুষ্ঠান পরব বলেই বেশি পরিচিতি লাভ করে এবং তাতেই দার দ্যোতনা বেশি। ছোটনাগপুর অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার বৃহত্তর জনজীবনে টুসু,করম,বাঁদনার মতই এক বহুল প্রচলিত হল জিতা পরব।

সূচি-
আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মা-সন্তানের অপত্য ভালোবাসা স্নেহের মায়াজালের সংস্কৃতিযুক্ত এই জিতা পরব পালিত হয়। সধবা বধূরাই এই জিতাষ্টমী পালন করে।

জিতাষ্ঠমীর গোড়ার কথা:-

জিতাষ্টমী প্রচলনের পিছনে নানান কথা,কাহিনি,লোকগাথা প্রচলিত আছে। তবে, সন্তান লাভের জন্য
সূর্যপুত্র জীমুতবাহনের ব্রত জিতাষ্টমীর ব্রত নামে পরিচিত। কথিত আছে, কোন এক প্রদেশের জনৈক শালিবাহন নামের এক ধার্মিক (সূর্যের উপাসক) রাজা এবং তার রানী নি:সন্তান থাকার জন্য অনেক দু:খে কষ্টে ছিলেন, সন্তান লাভের আশায় যাগ,যজ্ঞ,পূজা-অর্চনা, মাদুলি তাবিজ সহ নানান প্রচেষ্টার পরেও সন্তানাদির জন্ম হচ্ছিল না। ঐ রানী একদিন স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে এক দেবতার বার্তা পেলেন, ” তুমি জিতাষ্টমীর ব্রত কর, তাহলেই ছেলেপিলে হবে”। জিতাষ্টমী পালনের পরেই রাজা ও রানী সন্তান সম্ভবা হন এবং দুই ছেলে মেয়ের জন্ম দেন। রাজা শালিগ্রামের স্ত্রী তথা রানী আসলে সূর্যদেবের আশীর্বাদে সন্তান লাভ করেন। যাই হোক, রাজা ও রানী, পুত্রের নাম জীমুতবাহন এবং কন্যার নাম সুশীলা রাখেন।

লোককথা এবং শাশুড়ি -বৌমার উত্তরাধিকার কালক্রমে এই সন্তান সন্ততি বড় হয়। ছেলে জীমূতবাহনের বিয়ে হয়,বাড়িতে বৌমা আসে।কিন্তু বিধি বাম। রাজপুত্র জীমুতবাহন এবং তার স্ত্রীর জন্ম দেওয়া সন্তান জন্মের অব্যবহিত পরেই মারা যেতে থাকে। আসলে জীমূতবাহনের স্ত্রী তার শাশুড়ী মায়ের জিতাষ্টমী পালনের সময় নানান লোকাচার দেখে ঠাট্টা তামাশা করত। জিতাষ্টমী পালনের শাশুড়ির প্রতি এই তাচ্ছিল্য থেকেই জীমুতবাহনের স্ত্রীর পাপের কারণেই তার জন্ম দেওয়া সন্তানের প্রায় সবকটিই জন্মের পরপরেই মারা যেতে থাকে। রাজা শালিগ্রামের রানী তার পুত্রবধুকে তখন জিতাষ্টমী পালনের মাধ্যমে তার পুত্রবধূর এই আপদ দূর করতে চাইলে পুত্রবধূটি জিতাষ্টমীর জন্য পালনীয় আচারকে ছেলেখেলার মত আচার আচরণ বলে দাগিয়ে দিয়ে বলে, ” না মা, ঐ ধরণের ছেলেখেলা আমি করতে পারব না”। শাশুড়ী এরপর তার নিজের জীবনে নি:সন্তান থেকে সন্তান লাভ করার জন্য সেই স্বপ্নাদেশের গল্প শোনায়।এরপর খানিক ভয় পেয়ে বৌমার মধ্যে মানসিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা থেকেই বৌমা শাশুড়ীর সংগে জিতাষ্টমীর পূজা করতে থাকে। এরপর জীমূতবাহন ও তার স্ত্রীর কোন সন্তান আর জন্মের পরেই মারা যায়নি, স্বাভাবিক ভাবেই বড় হতে থাকে। সেই থেকেই ধুমধাম করে জিতাষ্ঠমীর পূজার প্রচক্ন শুরু হয়। এখনো এই সাংসারিক রেওয়াজ জিতাষ্টমী পালনে স্পষ্ট ভাবেই লক্ষ করা যায়। তাই দেখি, প্রত্যেক গৃহবধূ তার শাশুড়ীর কাছ থেকেই এই পূজা করার উত্তরাধিকার গ্রহণ করে। শাশুড়ী শক্ত,সামর্থ্য থাকাকালীন সাধারণত নিজেই পূজা করেন এবং তারপরে একদিন বধূর হাতে পূজার ভার তুলে দেন।

জিতাষ্টমীর পালন এবং মাতৃস্নেহ: – জিতাষ্টমী পূজিত বা পালনীয় শুরুর নেপথ্যেই মায়ের সন্তান কামনাই প্রথম এবং প্রধান কারণ ছিল। করম পরব যেমন ভাই – বোনের নিবিড় সম্পর্কের ইতিকথা,
তেমনই জিতা হল মা- সন্তানের নিখাদ স্নেহের অনুচ্চারিত গীতবিতান।
সন্তান প্রাপ্তির ব্যাকুলতায় মা যেমন ভীষণ উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে সেই সন্তানের বর্তমান ও আগামী জীবনের মঙ্গলকামনায় উপবাস রাখেন মা।
সন্তানের অমঙ্গলের ছায়া এড়ানোর জন্য, আড়াই দিন নির্জলা উপবাস থেকে পুকুরের জলে ডুব দিয়ে শশাকে আড়াই কামড়ে কামড়ে খায়, যাকে বলে “আড়াই কামড় অনুষ্ঠান”। সপ্তমীর দিন শুরু হয় জিতা পরবের পালন, সেদিন ষষ্টীর বার। পরদিন ভোরে, অষ্ঠমীর দিন সূর্যোদয়ের আগে গৃহিনী দই,দুধ,চিড়ে সহযোগে ‘ফলার’ সেরে সারাদিন উপোস করেন। বিকেলে পুরোহিত সহযোগে পুজো, সেখানে আঁখ(ইক্ষু),মাদাল গাছের ডাক পুঁতে জীমূতবাহনের প্রতিষ্ঠা করা হয়। ব্রতধারিণী বধূরা একে একে এসে পুজো দিয়ে ব্রতের ডালা নিয়ে বাড়ি যায়। পরদিন পুকুর ঘাটে গিয়ে ষষ্ঠী দেবীর পূজা দেয় এবং সেই ব্রত ভঙ্গ করার জন্য এক হাতে দই, চিড়া এবং অন্যহাতে শশা নিয়ে পুকুরে ডুব দিয়ে তাতে ‘ আড়াই কামড়’ দিয়ে খান। উল্লেখ্য যে, এই ষষ্ঠী দেবী হল সন্তানের মঙ্গলকামনার দেবী। মায়েরা সহ বাড়ির সবাই বিশ্বাস করে এই ষষ্ঠী দেবীই নিজের ইচ্ছেয় সন্তানকে হাসান এবং কাঁদানও। তাঁর হাতেই সন্তানের হিতাহিতের ভার। এই ষষ্ঠী দেবীর মূর্তি সিন্ধু সভ্যতায় আবিষ্কৃত হয়েছে, ফলত এই জিতাপরব তথা ষষ্ঠীদেবীর পূজা প্রাক্ আর্যকাল থেকেই হয়ে আসছে।
ছোটনাগুপুরের বিস্তীর্ণ এলাকার সংস্কৃতিতে জিতা পরবের ডাল পূজার সংস্কৃতি এবং বট গাছের অনুষঙ্গ এখানের জনজাতির প্রকৃতি প্রেমের পরম্পরাকেই তুলে ধরে।
দেবদেবীর প্রতি বিশ্বাস, সন্তান স্নেহ আর প্রকৃতি প্রেমের ত্রিফলা সংযোগের সমন্বয়েই আজ জিতা পূজায় মেতে পুরুলিয়া সহ গোটা রাঢ় বাংলা।

( লেখকের মতামত নিজস্ব )

Post Comment