বিশ্বজিৎ সিং সর্দার, (তুন্তুড়ি) বাঘমুন্ডি:
বলিউডি নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু রহস্য থেকে কলঙ্কমুক্তি পুরুলিয়ার।
সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল অভিনেত্রী তথা সুশান্তের বান্ধবী রিয়া চক্রবর্তীর নাম। রিয়ার পৈতৃক বাড়ি পুরুলিয়া জেলার বাঘমুণ্ডি থানার তুন্তুড়িতে ।সে কারণেই বছর পাঁচেক আগের সেই চাঞ্চল্যকর মামলায় বারে বারে জড়িয়ে গিয়েছে পুরুলিয়ার নাম। অবশেষে সেই কলঙ্ক থেকে মিলল মুক্তি।

হাতে প্রমাণ নেই বলে সুশান্ত মামলা বন্ধ করল সিবিআই। শনিবার তারই চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। মুম্বই আদালতকে সিবিআই এই মামলার অন্তিম রিপোর্ট জমা দেয়। প্রাথমিক ভাবে, মামলাটি আত্মহত্যা বলেই জানানো হয়েছিল। চূড়ান্ত রিপোর্টে সেটাই নিশ্চিত করল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা৷ রিপোর্টে তারা জানিয়েছে, আত্মহত্যাই করেছিলেন অভিনেতা সুশান্ত।

২০২০ সালের ১৪ জুন অভিনেতার মৃত্যু নিয়ে তোলপাড়া হয় গোটা দেশ। আত্মহত্যা নয়, সুশান্তকে খুন করা হয় বলেই অভিযোগ জানিয়েছিলেন অভিনেতার বাবা। জড়িয়ে গিয়েছিল রিয়ার নাম। সঙ্গে উঠে এসেছিল পুরুলিয়ার প্রসঙ্গ। তদন্তে উঠে আসে সুশান্তের মাদকাসক্তির বিষয়টি। মাদক যোগে গ্রেফতার করা হয় রিয়াকে।সিবিআইয়ের চূড়ান্ত তদন্তে খুন বা মাদক সংক্রান্ত কোনও দিক উঠে আসেনি।

সংবাদ মাধ্যমকে রিয়া চক্রবর্তীর আইনজীবী সতীশ মানেশিন্ডে বলেন “মিডিয়া ট্রায়ালে যে পরিমাণ মিথ্যা বর্ণনা প্রচার করা হয়েছে তার প্রয়োজন ছিলো না। নিরীহ মানুষকে ধরে ধরে রীতিমতো হেনস্থা করা হয়েছে। এমন একটা কঠিন সময়ে সমস্ত রকম অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ধৈর্যধরে নীরব থাকার জন্য রিয়ার পরিবারকে স্যালুট জানানো দরকার।”
পুরুলিয়ার তুন্তুড়িতে নিজের ৬ বছর বয়সে পা রেখেছিলেন রিয়া। বাড়ির ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে এসেছিলেন তাঁরা। এলাকায় তাঁদের পরিবার দেওয়ান পরিবার নামে পরিচিত। রিয়ার বাবা ইন্দ্রজিৎ চক্রবর্তীর অর্থ সাহায্যে তৈরি হয়েছে পারিবারিক দুর্গাপুজোর নানা জিনিসপত্র রাখার স্টোর রুম।

তুন্তুড়িতে রিয়াদের সেই দোতালা বাড়ি জুড়ে জঙ্গল। দরজায় বাসা বেঁধেছে উইপোকা। মরেচে ধরেছে দরজার তালায়। রিয়াদের বাড়ি ঘেঁষে থাকা তুলসিতলাতেও ঝোপঝাড়। এই বাড়িতে রিয়ার বাবা ইন্দ্রজিৎ চক্রবর্তী শেষ কবে এসেছিলেন, তা সঠিকভাবে মনে করতে পারলেন না কেউই। অভিনেত্রীর ঠাকুরদা শ্রীশ চক্রবর্তীর ছেলেবেলা কাটে এই বাড়িতেই। তিনি ধানবাদের বিসিসিএলের একটি কোলিয়ারির ম্যানেজার ছিলেন। তাঁর বাবা রামময় চক্রবর্তী ছিলেন আইনজীবী।

তাঁর সময়েই এই পরিবার এই এলাকার হাইস্কুল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্য প্রায় সাতাশ বিঘা জমি দান করে। এলাকার বারোটি মৌজার দেওয়ান ছিলেন চক্রবর্তীরা। বনেদি পরিবারটি নানান সমাজসেবায় যুক্ত। ফলে সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু রহস্যে এলাকার এই খ্যাতনামা পরিবারটির নাম যুক্ত হয়ে যাওয়ায় মনে আঘাত পেয়েছিলেন এলাকাবাসী।

শনিবার সিবিআইয়ের চূড়ান্ত রিপোর্ট তাঁদের ক্ষতে প্রলেপ দিলো। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর মামলায় ফুল স্টপ পড়ার পর প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তুন্তুড়ি গ্রামের মানুষজন।

তুন্তুড়ি গ্রামের বাসিন্দা নীহারবরন রায় বলেন, ” তাদের আদি বাড়ি এই গ্রামে হলেও রিয়া চক্রবর্তীর বাবা মা চাকরির সূত্রে বাইরে থাকতেন। দুর্গা পূজার সময় গ্রামের বাড়িতে আসতেন। রিয়ার বয়স যখন পাঁচবছর বয়স ছিল, তখন একবার এই গ্রামের বাড়িতে এসেছিল। আর আসেনি।

তারপর সুশান্ত সিং এর ঘটনা ঘটে। সেখানে অভিযুক্ত হওয়ার পর আজ দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ক্লিনচিট পেয়েছে রিয়া।
এই সমস্ত বিষয়টাই ছিল তদন্ত সাপেক্ষ। এখানে আমাদের মন্তব্য করার কিছুই নেই। কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ঘটনায় চূড়ান্ত রিপোর্ট বা ক্লিন চিট দিয়েছে সেখানে আমাদের কিছু বলার নেই।”
ওই গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা পূর্ণিমা মুড়া বলেন “রিয়া চক্রবর্তী বিষয়ে আগে শুনিনি। ২০২০ সালে সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর ঘটনার পর তার বিষয়ে জানতে পারি। জানতে পারি তার আদি বাড়ি এই গ্রামেই। তবে সে এখানে না থাকলেও সে তো এই গ্রামেরই একজন মেয়ে। সে ক্লিন চিট পেয়েছে, তাতে আমরা খুশি।”
তুন্তুড়ি গ্রামের বাসিন্দা যমুনা মুড়া বলেন,”রিয়ার ছোটবেলায় তাকে একবার দেখেছিলাম। দুর্গাপূজার সময় সে এসেছিল। এছাড়া তার বাবা এই গ্রামে প্রায়ই আসতেন। আজ এতদিন পর রিয়া নির্দোষ সাব্যস্ত হয়েছে তাতে আমরা খুশি।”
Post Comment