দেবীলাল মাহাত, আড়শা:
“বেণীমাধব, বেণীমাধব তোমার বাড়ি যাবো/ বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কথা ভাবো?”
কবি জয় গোস্বামীর বেণীমাধব নন। তবে ইনিও বেণীমাধব! যিনি সকালের আলো ফোটার সাথে সাথে শুরু করেন তার পথ চলা। পাখিদের কিচিরমিচির ডাকের আওয়াজে শুরু হয় বাড়িতে বাড়িতে খবরের কাগজ পৌঁছে দেওয়া। শীত, গ্রীষ্ম ও ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঘর থেকে বার হওয়া। কোন দিন তার ব্যতিক্রম হয়নি। সমতল থেকে অযোধ্যাপাহাড় প্রায় ২০ কিমি পথ, ৩৫ বছর ধরে সাইকেলে করে নিরলস ভাবে গ্রাহকের বাড়িতে বাড়িতে খবরের কাগজ পৌঁছে দেন সংবাদ বিক্রেতা বেণীমাধব। যাকে সবাই চেনে ‘বেনী’ নামে। পুরো নাম বেণীমাধব দত্ত। বাড়ি পুরুলিয়ার আড়শা থানার সিরকাবাদে। বয়স ৫৩।
সময়ের সাথে সাথে বদলেছে দিন। সকলের হাতের মুঠোয় এসেছে মোবাইল। মোবাইল খুললেই দেশ, বিদেশ সহ এলাকার খবরের ছড়াছড়ি। তবে খবরের মাধ্যম পরিবর্তন হলেও, পেশা ছাড়েননি বেণীমাধব। দেশ তথা সারা বিশ্বের খবর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ায় যেন তার ব্রত।

অযোধ্যা পাহাড়তলির সিরকাবাদে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক
ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। গ্রামের বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে এজেন্টের হাত ধরে শুরু করেছিলেন খবরের কাগজ বিক্রির কাজ । সেই শুরু। তারপর দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে যুক্ত আছেন সংবাদ পত্র বিক্রির পেশায়। আড়শা ব্লকের সিরকাবাদ, গন্ধবাজার,
আহাড়রা, জামবাদ, লছমনপুর সহ বাঘমুন্ডি ব্লকের অযোধ্যা পাহাড়ের উপরের গ্রাম গুলিতে বাড়িতে বাড়িতে দিয়ে যান সংবাদপত্র। কোন গ্রাম ২কিমি, আবার কোনো গ্রাম ৪-১৫ কিমি। সাইকেলে করে বিভিন্ন গ্রাম, অফিস, হাসপাতাল স্কুল ঘুরে ঘুরে সংবাদপত্র বিলি করে ফি দিন বাড়ি ফিরতে আঁধারই নেমে আসে। রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে আবার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়া। এইভাবেই একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত সাইকেল চালিয়ে সংবাদপত্র পৌঁছে দেন মানুষের কাছে।সিরকাবাদ গ্রামের বাসিন্দা তথা পেশায় শিক্ষক সলিল মাঝি জানান, “প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি পেপার বিক্রির সাথে যুক্ত আছেন। এই পেশাটাকে তিনি রপ্ত করতে পেরেছেন। তার জন্যেই আমরা ঘুম থেকেই উঠেই সংবাদপত্র হাতে পাই । বেণীমাধব জানান, “এমনও দিন গিয়েছে অযোধ্যা পাহাড় থেকে নামার কোনো যানবাহন না পাওয়ায় হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। আবার বান্দু্র জলে বান আসায় আটকে গিয়েছি পাহাড়েই। কিন্তু পেশাকে ছাড়ার কথা কোনদিন ভাবিনি।” তাঁর কথায়, “দীর্ঘদিন কাজ করে এই পেশাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আর অন্য পেশায় যেতে যায় না।”
তবে তার আক্ষেপ, ইন্টারনেট, এনড্রয়েট, সোশ্যাল সাইটের দাপটে এখন অনেকটাই পেপার বিক্রি কমে গিয়েছে। ফলে কমেছে আয়। সংবাদপত্র বিক্রি করে যা রোজগার হয় সেটা দিয়েই কোনো রকমে চলে সংসার। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে? আক্ষেপ ঝরে পড়ে তার গলায়। কথা শেষ হতেই আবার সাইকেলের প্যাডেলে পা। আজকের কাগজ, আজকেই সময় মতো দিয়ে যে শেষ করতে হবে! সাইকেল চালিয়ে জঙ্গলের রাস্তায় মিলিয়ে যান বেণীমাধব। সঙ্গী সংবাদ পত্র।এই ভাবেই তিন দশকের বেশি সময় ধরে চড়াই-উতরাই পথ ধরে অযোধ্যা পাহাড় সহ পাহাড়তলির গ্রামগুলোতে বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দেন সংবাদপত্র।
Post Comment