insta logo
Loading ...
×

বিকিকিনির ফ্যালেন্টাইন

বিকিকিনির ফ্যালেন্টাইন

সুজয় দত্ত

ফেব্রুয়ারি মাস। বাতাসে বসন্ত বারতা। বিকিকিনির কালে কে যেন ডাক দিয়েছে নবীনেরে। দিন গুনতে গুনতে ফেব্রুয়ারির চৌদ্দ। ভ্যালেন্টাইন শ্রাদ্ধ। তারও আগে আছে, আছে পরে। আমরা দেহাতের লোক। এখন বুঝি, প্রেম মানে দুচোখের আপাত ঝিলিক আর দিনভর প্রাণ উচাটন নয়, প্রেম মানে আঙ্গুলে আঙ্গুল ঠেকে যাওয়া বিদ্যুৎ শিহরণ নয়, বিকিকিনির এ দুনিয়ায় প্রেমও হয়েছে পণ্য। একটা ফুল, একটা চকলেট আর তার হরেক মোড়কে ভালোবাসা নিজেকে ওজন করে নিতে চায়।
কবিগুরু লিখেছিলেন, “সহে না যাতনা

দিবস গণিয়া গণিয়া বিরলে

নিশিদিন বসে আছি শুধু পথপানে চেয়ে–

    সখা হে, এলে না। " যাতনা সহ্য করতে না পারার বিষয়টা না হয় বোঝা গেল। দিন গোণার ব্যাপারটা তো পরিষ্কার হলো না। রবি ঠাকুর কি টাইম মেশিনে চড়ে একুশ শতকে এসে গিয়েছিলেন? ভ্যালেন্টাইন শুধু নয়, বাজার সর্বস্ব জগতে প্রেমের দিনে ছয়লাপ ইভেন্ট ফেব্রুয়ারি। আর... অবাক করা তথ্য তথাকথিত দেহাতের নবম দশম একাদশ দ্বাদশ অনায়াসে গড়গড় করে সেসব দিনের তাৎপর্য প্রাঞ্জল করে বুঝিয়ে দেবে আপনাকে। ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু। গোলাপ দিবস। বাজার বলছে প্রিয়জনকে গোলাপ দাও। তারপর ৮ ফেব্রুয়ারি। প্রপোজ ডে। প্রেম নিবেদন। ৯ তারিখ চকোলেট ডে। তাতেও খুশি না হলে ১০ তারিখ টেডি বিয়ার দিবস। একটা লোমশ কুকুর নিয়ে খুকি খুকি আহ্লাদ। ১১ ফেব্রুয়ারি প্রমিস ডে। প্রতিশ্রুতি দিবস। ১২তে আলিঙ্গন। উষ্ণায়নের আরও এক মাত্রা। ১৩ তারিখ বিম্বিত ওষ্ঠা অধর স্পর্শের সুধা। চুম্বন দিবস। ১৪তে বাজারমাত করা ভ্যালেন্টাইন ডে। অফুরান স্ফুর্তির চাবিকাঠি। আর ১৫ ফেব্রুয়ারি রোমান্স ডে। উফফ! নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে! পণ্যায়নের এই যুগে বিকিকিনির বাজারে যারা ছেলেমেয়েদের এঁচোড়ে পাকা করে তুলল, ব্রাদার হ্যাটস অফ টু তাদের বিজনেস মাইন্ড! কী কল বানালেন দাদা! গাঁ থেকে টাউন পুড়ে ছারখার।  এত উপহার, এত দেখনদারি, এত কোলাহলে কি আসবে সখা? কদম বনে অপেক্ষমান শ্যামের বাঁশরী কি টেনে আনবে রাইকে? প্রেম যে শুদ্ধতার আস্বাদন আনে, যে নিভৃত চারণে নিজের সৌন্দর্য ছড়ায়, সে কি দেখা দেবে এই উদ্দাম ভিড়ে? নাকি সে কেবলই হয়ে থাকবে টাইম পাস? লটারি খেলা? 

কথায় আছে গল্পের গরু গাছে চড়ে। ১৪ ফেব্রুয়ারী দিনটিকে নিয়ে ব্যাপক হৈ চৈ সেই কথাটির সত্যতাকেই প্রমাণ করে। পাশ্চাত্য প্রেম দিবস হিসাবে বহুদিনই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে দিনটি। আর আমরা তো মুক্তমনা! সব কিছু আঁকড়ে ধরতে বড়ই পটু। সুতরাং বাংলা ক্যালন্ডারে অনায়াসে ঢুকে পড়েছে ভ্যালেনটাইনস ডে। আসলে ফ্যালেনটাইন। ফ্যালো কড়ি, করো প্রেম। হুঁ হুঁ বাবা! বহুজাতিকের থাবা। গ্রিটিংস কার্ড আর হরেকরকম উপহার সামগ্রীর আবহে বিকিকিনির হাট চলে ভ্যালেনটাইনস বাজারে। কার উপহার কতটা মহার্ঘ তাই দিয়ে যেন প্রেমের গভীরতা মাপা হয়, সঙ্গে হর্ষোল্লাসে মাতে মিডিয়া। ছেলেমেয়ের কচি মাথা চিবিয়ে খেতে যাদের জুড়ি মেলা ভার! কত রকম ভাবে ভ্যালেনটাইনসডে উদযাপন করা যেতে পারে-তাই নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা।

ভ্যালেনটাইনস ডে কী? প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। যতদূর জানা যায় ৫০০খ্রিস্টাব্দে রোমান যাজক ক্যালেন্ডারে দিনটির অন্তর্ভুক্তি ঘটান পোপ প্রথম গেলসিয়াস। দিনটির সঙ্গে প্রেম পিরিতের কোন সম্বন্ধই ছিল না তখন। ইংরেজি সাহিত্যে প্রেমকাব্য সম্বলিত মধ্যযুগে জিওফ্রে চসারের সময়ে দিনটি এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করে। প্রাচীন পাশ্চাত্যে ধর্মের জন্য যে সকল যাজক মৃত্যুবরণ করতেন তাদের মারট্যার (Martyrs) বলা হত। দ্য ক্যাথলিক এনসাইক্লোপিডিয়া অনুযায়ী বলা হয় সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু হয়েছিল আফ্রিকায় তার অন্যান্য সঙ্গী সাথিদের সঙ্গে। তারিখটা ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। প্রাচীন ইতিহাসে ভ্যালেনটাইনের সঙ্গে প্যায়ার মোহব্বতের কোন সংস্রব ছিল না। বিষয়টি নানান কাহিনির হাত ধরে চতুর্দশ শতকে কেন জানিনা ১৪ফেব্রুয়ারির সঙ্গে জুটে যায়। একটা কাহিনি বলে, খ্রিশ্চান হবার কারণে স্বয়ং রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্যাডিয়াস সেন্ট ভ্যালেনটাইনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকেন। সেন্টের জ্ঞান গম্যি সম্রাটকে মুগ্ধ করে.। ভ্যালেনটাইনের প্রান বাঁচানোর জন্য তাঁকে রোমান পেগান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করেন সম্রাট। একগুঁয়ে ভ্যালেনটাইন সে ধার তো মাড়ালেনই না, উপরন্তু ক্লডিয়াস-কে খ্রিশ্চান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার প্রয়াস শুরু করলেন। অগত্যা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় তাকে। কথিত আছে জেলে থাকাকালীন তিনি কারাধ্যক্ষের অন্ধ কন্যার দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

এ গল্পেও ইস্ক বিস্ক প্যার ব্যার-এর বালাই ছিল না। অন্য কাহিনি বলে, রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস একটি আইন চালু করেছিলেন। তাঁর মতে যুবকদের থাকতে হবে অবিবাহিত। তাঁর ধারণা ছিল বিবাহিত যুবকরা ভাল সৈন্য কখনও হতে পারেনা। শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে এই পন্থা গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই আইনের তীর বিরোধিতায় নামেন সেন্ট ভ্যালেনটাইন। গোপনে তিনি যুবক-যুবতীদের বিয়ে দেওয়া শুরু করেন। ক্লডিয়াস বিষয়টি জানতে পেরে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন। কারারুদ্ধ করা হয় ভ্যালেনটাইনকে। কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও এ গল্পের লেজুড় হিসেবে স্থান পেয়েছে আর একটি কাহিনি। মৃত্যুর পূর্বের সন্ধ্যায় সেন্ট ভ্যালেটাইন একটি চিঠি লেখেন। পৃথিবীতে সেটাই প্রথম ভ্যালেনটাইন কার্ড। এক তরুণীকে প্রেমিকা সম্বোধন করে কার্ডটি লিখেছিলেন তিনি। সেই তরুণীই ছিল সেই জেলারের কন্যা-যাঁর হারানো দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ভ্যালেনটাইন। চিঠিতে লেখা-ফ্রম ইয়োর ভ্যালেনটাইন।’

গল্পের গরু গাছে ওঠে। এখানে তার একটা কারণ বড়ই সুস্পষ্ট। বাজার। সবার উপরে বাজার সত্য। এত উপহার-না বেচলে চলে?

Post Comment