শুভদীপ মাহাত, পুরুলিয়া:
বিধানসভা নির্বাচনের আগে জঙ্গলমহলের বাতাসে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ফিসফাস। সদ্য গেরুয়া শিবিরের প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা প্রকাশ্যে এসেছে। আর ঠিক তারপরেই পুরুলিয়ার সাংসদ এবং রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোর আচমকা দিল্লি সফর এই জল্পনাকে এক ধাক্কায় অনেকটা উসকে দিয়েছে। জঙ্গলমহলের রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন, এবার পদ্ম শিবিরের জোট সঙ্গী দলের টিকিটে বিধানসভার লড়াইয়ে নামতে চলেছেন প্রথম সারির দুই কুড়মি আন্দোলনকারী? আর এই সম্ভাব্য নামের তালিকায় সবচেয়ে বেশি ওজনদার যে নামটি ভাসছে, তা হলো আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল-খুঁটি, মূল মানতা (প্রধান উপদেষ্টা) অজিতপ্রসাদ মাহাতর পুত্র বিশ্বজিৎ মাহাত। জল্পনার আগুনে আরও কিছুটা ঘি ঢেলেছে বুধবার খোদ মূল মানতার দুটি মোবাইল নম্বর সুইচড অফ থাকার ঘটনা। বিশ্বজিতের প্রার্থীপদ নিয়ে সমাজমাধ্যমেও নেটিজেনদের চর্চা এখন তুঙ্গে।
অন্যদিকে, কুড়মি ভোটব্যাঙ্ককে হাতিয়ার করে দক্ষিণ বাংলার রাজনীতিতে শক্তপোক্ত জমি তৈরিতে মরিয়া ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চা। তারা ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে জঙ্গলমহলের মোট ১১টি কেন্দ্র থেকে লড়াই করবে দল। সেই রণকৌশল এবং চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করতে বুধবার খাস ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন জেএলকেএম নেতৃত্ব। দলের সুপ্রিমো তথা ঝাড়খণ্ডের ডুমরির জনপ্রিয় বিধায়ক টাইগার জয়রাম কুমার মাহাতর নেতৃত্বে আয়োজিত এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠক ঘিরে উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। আগামী ২১শে মার্চ পুরুলিয়ার ঝালদা সংলগ্ন তুলিনে টাইগারের এক মেগা জনসভা রয়েছে, যাকে কেন্দ্র করে এলাকার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জঙ্গলমহলের এই নয়া মেরুকরণ একদিনে তৈরি হয়নি। চব্বিশের লোকসভা ভোট থেকেই বেশ কয়েকটি কুড়মি সংগঠন ক্রমশ বিজেপির দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছিল। যার সূত্রপাত ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে, যখন আদিবাসী কুড়মি সমাজ প্রথমবার ‘নো ভোট টু টিএমসি’ স্লোগান তুলে শাসকদলের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান নেয়। আজ পর্যন্ত সেই অবস্থান থেকে তারা একচুলও সরে আসেনি। এর মাঝে ‘কুড়মি সমাজ পশ্চিমবঙ্গ’-এর প্রধান উপদেষ্টা রাজেশ মাহাত জঙ্গলমহলের ঝাড়গ্রাম জেলার গোপিবল্লভপুর বিধানসভায় বিজেপির টিকিট পাওয়ায় কুড়মিদের মধ্যে তৃণমূল-বিরোধিতা আরও ধারালো হয়। অতীতে এই রাজেশ মাহাতকে সঙ্গে নিয়েই মূল মানতা অজিতপ্রসাদ খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দরবারে গিয়েছিলেন সমাজের দাবিদাওয়া নিয়ে। সেদিনের আশ্বাসে মূল মানতা পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী কুড়মি সমাজের সাথে বিজেপির এক অঘোষিত ‘আঁতাত’ বা বোঝাপড়া ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। চব্বিশের লোকসভায় পুরুলিয়া কেন্দ্র থেকে মূল মানতা নিজে প্রার্থী হয়ে প্রচারে ঝড় তুললেও ভোটবাক্সে এক লক্ষের গণ্ডিও পেরোতে পারেননি। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, তখনই জঙ্গলমহলের বাতাসে ভাসা বিজেপি-কুড়মি ‘সেটিং তত্ত্ব’ রাজনৈতিকভাবে মান্যতা পেয়েছিল।
এদিকে, রাঁচির বৈঠক থেকে জেএলকেএম-এর সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি রূপরেখাও উঠে আসছে। দলীয় সূত্রের খবর, দলের পুরুলিয়া জেলা সভাপতি (পশ্চিমাঞ্চল) গোপালচন্দ্র মাহাত বাঘমুন্ডি আসন থেকে লড়াইয়ের টিকিট পেতে চলেছেন। এছাড়াও বলরামপুরে সুরেশ মাহাত, পুরুলিয়া সদরে লক্ষ্মণ মাহাত, কাশিপুরে রঞ্জিত মাহাত এবং পাড়া কেন্দ্রে অমিতকুমার বাউরির নাম একপ্রকার সিলমোহর পাওয়ার অপেক্ষায়। তবে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জয়পুর আসনে প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। সেখানে ভুবনেশ্বর কুমার, অর্জুন কুমার এবং সুচিত্রা মাহাতর নাম নিয়ে দলের অন্দরে টানাপোড়েন চলছে। পাশাপাশি বান্দোয়ান ও রঘুনাথপুরের প্রার্থীর নামও এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে খবর। তবে জেএলকেএম নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়েছে, আগামী ২০শে মার্চ, অর্থাৎ টাইগারের মেগা জনসভার ঠিক আগেই জঙ্গলমহলের এই ১১টি আসনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে দেওয়া হবে।









Post Comment